Skip to content

৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

মহাভারতের রাধা: হতভাগ্য এক মায়ের চিত্র


মহাভারতের এক অসহায় মায়ের চিত্র রূপায়িত হয়েছে ‘রাধা’ চরিত্রের মধ্য দিয়ে। ভীষ্মের রথের সারথী অধিরথ ও মহাভারতের অন্যতম চরিত্র কর্ণের পালক মাতা রাধা। পাণ্ডবদের মাতা কুন্তী আশীর্বাদরূপে পুত্রেষ্ঠী মন্ত্র লাভ করেন। কুমারী অবস্থায় একদিন কুন্তী কৌতূহলবশত মন্ত্রবলে সূর্যদেবকে আহ্বান করেন। সূর্যদেব উপস্থিত হলে ভীত কুন্তী তাকে অজ্ঞানতাবশত দেবতাকে আহবান করে। মন্ত্রের সম্মান রক্ষার্থে সূর্যদেব তার গর্ভসঞ্চার করতে বাধ্য হন। সূর্যের সঙ্গে মিলনের ফলে তার গর্ভে কবচকুণ্ডল পরিহিত কর্ণের জন্ম হয়।

বিবাহের পূর্বে কর্ণের জন্ম হওয়ায় কুন্তী লোকনিন্দার ভয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। সমাজে নিজের সম্মান রক্ষার তাগিদে শিশুপুত্রকে একটি বেতের বাক্সে শুইয়ে নদীতে ভাসিয়ে দেয়। ভীষ্মের রথের সারথী অধিরথ ও তার স্ত্রী রাধা দেবী তাঁকে উদ্ধার করেন। তারা কর্ণকে পুত্রস্নেহে পালন করতে থাকেন। তাঁর নাম হয় বসুষেন। কর্ণকে ‘রাধেয়’ নামেও ডাকা হয়ে থাকে। কর্ণের পালক মাতা রাধা ও পালক পিতা অধিরথ নিজের গোত্রের মধ্যে থেকেই কর্ণকে লালন পালন করতে চাইলেও কর্ণের শরীরে ক্ষত্রিয়ের রক্ত প্রবাহিত হওয়ায়, সে নিজেকে পিতামাতার আজ্ঞাবহ না করে নিজের ইচ্ছেকে গুরুত্ব দেয়। কিন্তু রাধা কখনো জানতেও দেননি কর্ণ তার গর্ভজাত সন্তান নয়। তবুও কর্ণের পক্ষ থেকে মায়ের আদেশ শিরোধার্য হয়নি। এক্ষেত্রে রাধার জীবনেই নেমে এসেছে দুঃখ-কষ্ট। নিজের সন্তান না থাকায় কর্ণকেই বুকে ধারণ করেছেন। তবু, দুর্যোধনের প্ররোচনায় নিজ ধর্ম খুইয়ে অধর্মের পথে পা বাড়ান কর্ণ। রাধার হাহাকার কর্ণকে তার পথ থেকে সরাতে পারেনি।

একসময় কৃষ্ণের উপস্থিতিতে রাধাও জানতে পারেন, কর্ণ হলেন কুন্তীর সন্তান। পাণ্ডবদের অগ্রজ। সেখানেও রাধার হৃদয়ের দুঃখ-যন্ত্রণা পাঠকের মনোযোগ কেড়েছে। কিন্তু রাধার জীবনের সঙ্গে কর্ণের সংযোগ ঘটেনি। রাধার হতভাগ্য জীবনে একমাত্র সন্তানরূপে কর্ণকে পাওয়া। কিন্তু সেই কর্ণের করুণ পরিণতিও তাকে মেনে নিতে হয়েছে। রাধা যেন বর্তমান নারী সমাজের প্রতিনিধি। আবহমানকাল ধরে নারীরা সংসার-সন্তানের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করলেও নারীর ভাগ্যে জোটে করুণ পরিণতি। সমাজ-সংসারে আবদ্ধ রেখেও রাধা যেমন নিজের মাতৃত্ব রক্ষায় কোনো কার্পণ্য করেনি। তেমনি বাঙালি সমাজে নারীরা নিজেদের সর্বদা সন্তানের জন্য কল্যাণ কামনা করে।

দুর্যোধনের অপকর্মের সঙ্গী হয়ে হস্তিনাপুরের অঙ্গরাজ হয় কর্ণ। রাজা হলেও রাধা বা অধিরথ কেউ কর্ণের সঙ্গী হন না। বরং কর্ণকে ত্যাগ করেন। কিন্তু মায়ের মমতার কারণে অঙ্গরাজ হলেও রাধার শীতল ছায়াকে কামনা করেছেন কর্ণ। সেখানে রাধার জয়।

কিন্তু রাধার স্নেহ ভালোবাসা কষ্টে রূপান্তরিত হয়েছে। মহাভারতের যুদ্ধে কর্ণের নিহত হওয়ায় রাধার জীবনে বিষাদের ছায়া নামে। মা হয়ে সন্তানের মৃত্যু দেখতে হয় রাধাকে। কিন্তু দুঃখ ছাড়া কিছুই তার অবশিষ্ট থাকে না। সন্তান না হলেও কর্ণকেই রাধেয় পরিচয়ে লালন পালন করেন। কিন্তু সেই পরিচয় লুটিয়ে পড়ে মহাভারতের যুদ্ধে।

কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসদেব রাধা চরিত্র নির্মাণেও চরিত্রটির ব্যাপ্তির প্রতি সজাগ দৃষ্টি দেননি। বরং রাধাকে কর্ণকে বেড়ে ওঠার উপজীব্য করলেও রাধার জীবনের পরিণতি কী সেটাকে রেখেছেন অব্যক্ত। রাধা হয়ে উঠেছেন দুঃখিনী মাতা।

অনন্যা/এআই

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ