বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬
স্বাস্থ্য

পেট ভরা, তবু খেতে ইচ্ছা করছে? কারণ জানলে অবাক হবেন

WhatsApp Image 2026-07-08 at 7.23.49 PM

পেট ভরার পরও কেন থামে না খাওয়ার ইচ্ছা? জানুন অতিরিক্ত খাওয়ার নেপথ্যের বিজ্ঞান ও মুক্তির উপায়

রাতের খাবার শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগেই। পেটও বেশ ভরা। তবু ফ্রিজ খুলে আইসক্রিম বের করতে ইচ্ছা করছে, কিংবা টেবিলে রাখা চিপসের প্যাকেটটি যেন বারবার হাতছানি দিচ্ছে। এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়। প্রশ্ন হলো, শরীর যখন আর খাবার চায় না, তখনও কেন খেতে ইচ্ছা করে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব সময় ক্ষুধাই অতিরিক্ত খাওয়ার কারণ নয়। অনেক ক্ষেত্রেই এর পেছনে কাজ করে মস্তিষ্ক, হরমোন, আবেগ, ঘুমের অভাব এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের নানা অভ্যাস। এসব বিষয় সম্পর্কে সচেতন হলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

ক্ষুধা নয়, অনেক সময় দায়ী মস্তিষ্ক

Advertisements

আমাদের মস্তিষ্কে এমন একটি পুরস্কার-ব্যবস্থা (Reward System) রয়েছে, যা সুস্বাদু খাবার খেলে আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে। বিশেষ করে অতিরিক্ত চিনি, চর্বি ও লবণযুক্ত খাবার এই ব্যবস্থাকে বেশি উদ্দীপ্ত করে। ফলে পেট ভরে গেলেও মস্তিষ্ক আরও খেতে উৎসাহ দেয়। এ কারণেই অনেকেই মূল খাবার শেষ করার পরও ডেজার্ট বা ফাস্ট ফুডের লোভ সামলাতে পারেন না।

মানসিক চাপ বাড়ায় খাওয়ার প্রবণতা

কাজের চাপ, পারিবারিক সমস্যা, একাকিত্ব, হতাশা কিংবা উদ্বেগের সময় অনেকেই খাবারে স্বস্তি খোঁজেন। একে বলা হয় ইমোশনাল ইটিং বা আবেগজনিত খাওয়া। খাওয়ার সময় কিছুক্ষণের জন্য ভালো লাগলেও সমস্যার মূল কারণ দূর হয় না। বরং অতিরিক্ত ক্যালোরি শরীরে জমে ওজন বৃদ্ধি, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।

কম ঘুম, বেশি ক্ষুধা

নিয়মিত কম ঘুম হলে শরীরের ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী দুটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন- ঘ্রেলিন ও লেপটিনের ভারসাম্য নষ্ট হয়। এতে ক্ষুধা বেড়ে যায় এবং উচ্চ ক্যালোরিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়ে। তাই সুস্থ খাদ্যাভ্যাসের জন্য শুধু ভালো খাবার নয়, পর্যাপ্ত ঘুমও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

দ্রুত খাওয়ার ক্ষতি

অনেকে মাত্র ১০-১৫ মিনিটেই পুরো খাবার শেষ করে ফেলেন। অথচ মস্তিষ্ক বুঝতে প্রায় ২০ মিনিট সময় নেয় যে পেট ভরে গেছে। তাই খুব দ্রুত খেলে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাবার খাওয়া হয়ে যায়। ধীরে ধীরে খেলে শরীরের স্বাভাবিক তৃপ্তির সংকেত কাজ করার সুযোগ পায়।

খাবারের লোভ আর প্রকৃত ক্ষুধার পার্থক্য

প্রকৃত ক্ষুধা ধীরে ধীরে তৈরি হয় এবং যেকোনো পুষ্টিকর খাবারেই তা মেটে।
অন্যদিকে খাবারের লোভ হঠাৎ আসে এবং সাধারণত নির্দিষ্ট কোনো খাবার- যেমন আইসক্রিম, চকোলেট, পিৎজা বা বার্গারের প্রতিই আকর্ষণ তৈরি করে। এই পার্থক্য বোঝার অভ্যাস গড়ে তুললে অপ্রয়োজনীয় খাওয়া অনেকটাই কমানো যায়।

কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন?

১. ধীরে খান
প্রতিটি লোকমা অন্তত ২০–৩০ বার চিবিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করুন। এতে দ্রুত তৃপ্তি আসে।
২. প্রোটিন ও আঁশ বাড়ান
ডিম, মাছ, মুরগি, ডাল, দই, শাকসবজি ও ফল দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে।
৩. পর্যাপ্ত পানি পান করুন
অনেক সময় তৃষ্ণাকে আমরা ক্ষুধা বলে ভুল করি। খাওয়ার আগে এক গ্লাস পানি পান করে দেখতে পারেন।
৪. মনোযোগ দিয়ে খান
টিভি, মোবাইল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখতে দেখতে খেলে কখন কতটা খাওয়া হয়েছে, তা বুঝতে অসুবিধা হয়।
৫. পর্যাপ্ত ঘুমান
প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম শরীরের ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
৬. খাবার লুকিয়ে নয়, পরিকল্পনা করে খান
অনেকেই সারাদিন না খেয়ে থেকে রাতে অতিরিক্ত খেয়ে ফেলেন। নিয়মিত সময়ে পরিমিত খাবার খাওয়া বেশি উপকারী।
৭. স্ট্রেস কমান
হাঁটা, বই পড়া, গান শোনা, মেডিটেশন বা প্রিয় মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

যদি নিয়মিত এমন হয় যে আপনি নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত খেয়ে ফেলছেন, খাওয়া থামাতে পারছেন না, পরে অপরাধবোধে ভুগছেন বা ওজন দ্রুত বাড়ছে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন। কিছু ক্ষেত্রে এটি বিঞ্জ ইটিং ডিসঅর্ডার-এর লক্ষণ হতে পারে। এটি একটি স্বীকৃত মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা, যার চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং রয়েছে।

খাবার আমাদের শরীরের জ্বালানি, আবার আনন্দেরও একটি অংশ। কিন্তু যখন খাবার ক্ষুধা মেটানোর বদলে আবেগ সামলানোর উপায় হয়ে ওঠে, তখনই সমস্যা শুরু হয়। নিজের ক্ষুধার সংকেতকে গুরুত্ব দেওয়া, ধীরে খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন- এই কয়েকটি অভ্যাসই অতিরিক্ত খাওয়া নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। মনে রাখবেন, সুস্থ থাকার জন্য শুধু কতটা খাচ্ছেন তা নয়, কেন খাচ্ছেন- এই প্রশ্নের উত্তর জানাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

Advertisements
ক্ষুধাবিজ্ঞানমস্তিষ্কমানসিক চাপরাতের খাবারশরীর