‘গানের খালামণি’ কণ্ঠশিল্পী ফেরদৌসী রহমানের জন্মদিন আজ

কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী ফেরদৌসী রহমানের আজ ৮৫তম জন্মদিন। ১৯৪১ সালের ২৮ জুন পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহারে জন্ম নেওয়া এই সুরসম্রাজ্ঞী সাত দশক ধরে সুরের মায়াজালে বেঁধে রেখেছেন বাঙালিকে। বাবা লোকসংগীতের প্রবাদপুরুষ আব্বাসউদ্দীন আহমদের হাত ধরে গানে হাতেখড়ি হওয়া এই শিল্পী ধ্রুপদি, নজরুলগীতি, রবীন্দ্রসংগীত থেকে শুরু করে আধুনিক ও চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকে তৈরি করেছেন নিজস্ব এক সাম্রাজ্য। বিটিভির উদ্বোধনী দিনের প্রথম কণ্ঠ কিংবা ‘এসো গান শিখি’র প্রিয় ‘খালামণি’। সব পরিচয় ছাপিয়ে তিনি এ দেশের এক জীবন্ত ইতিহাস।

১৯৪১ সালের ২৮ জুন। বাংলায় আষাঢ় মাস। লুৎফুন্নেসা আব্বাসের কোলজুড়ে এল এক ছোট্ট কন্যাশিশু। তাঁর নাম রাখা হলো ফেরদৌসী বেগম, যাঁকে আমরা ফেরদৌসী রহমান নামে চিনি। তিন ভাই- মোস্তাফা কামাল, মুস্তাফা জামাল ও মুস্তাফা জামানের পর তিনি ছিলেন প্রথম কন্যাসন্তান। আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠেছিল পুরো পরিবার। বিশেষ করে তাঁর বাবা, কিংবদন্তি শিল্পী ও সুরের জাদুকর আব্বাসউদ্দীন আহমদ।
সেই সময় সমগ্র বাংলায় খ্যাতির শীর্ষে তাঁর অবস্থান। কলকাতা থেকে ছুটে এসে তিনি নবজাতক কন্যাকে বুকে জড়িয়ে বারবার চুমু খেতেন, আদরে ভরিয়ে দিতেন। তাঁর বাবা জাফর আলী আহমেদ হেসে বলতেন, ‘ ছেলেগুলোকে ছেড়ে আব্বাস মেয়েটাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। মনে হয় সমস্ত সম্পত্তি তাকেই লিখে দেবে।’ আক্ষরিক অর্থেই একদিন তিনি তাঁর সমস্ত ধনসম্পদ- অর্থাৎ তাঁর গান- এই ছোট্ট মেয়েটির কণ্ঠে তুলে দিয়েছিলেন। আদর করে রুশ দেশের মেয়েদের নাম অনুসারে তাঁর ডাকনাম রেখেছিলেন ‘মীরনা’। যেন তখন থেকেই কন্যার জীবনে আন্তর্জাতিকতার একটি মাত্রা যুক্ত করে দিয়েছিলেন।

ফেরদৌসী রহমানের বাড়িতে জন্মদিন সেভাবে উদ্যাপন করা হতো না। বড় ভাই (সাবেক প্রধান বিচারপতি) মোস্তফা কামালের জন্মদিন হইচই করে উদ্যাপন করা হতো। গান হতো, কবিতা হতো, খাওয়াদাওয়া হতো। ফেরদৌসী রহমানের জন্মদিন প্রথম ১৯৫৬ সালে উদ্যাপন করা হয়, যেদিন তিনি ম্যাট্রিকে স্ট্যান্ড করলেন, সারা দেশে মেয়েদের মধ্যে প্রথম হলেন। ২৬ জুন ফল বের হয়, ২৮ জুন ছিল তাঁর জন্মদিন।
গত এক বছরে ফেরদৌসী রহমান তিনজন আপন মানুষকে হারিয়েছেন। এর মধ্যে আছেন স্বামী রেজাউর রহমান, সংগীতজ্ঞ ভাই মুস্তাফা জামান আব্বাসী ও ভাইয়ের স্ত্রী আসমা আব্বাসী। সংগীতশিল্পী ফেরদৌসী রহমানের জন্মদিন স্বামী নীরবে উদ্যাপন করলেও ভাই মুস্তাফা জামান আব্বাসী ও তাঁর স্ত্রী আসমা আব্বাসী বেশ হইহুল্লোড় করতেন। ফুল আর কেক নিয়ে বনানীর বাসায় হাজির হতেন।

ফেরদৌসী রহমান বললেন, ‘আমি আসলে কখনোই সেভাবে জন্মদিন নিয়ে আগ্রহী ছিলাম না। তাই পালনও করতাম না। কিন্তু আমার স্বামী খুব নীরবে নানা আয়োজন করত। ইন্ট্রোভার্ট ছিল তো, কিছু করেও চুপচাপ থাকত। আর ভাই-ভাবি যত ব্যস্তই থাকুক, জন্মদিনে কেক আর ফুল নিয়ে চলে আসত। কেক কাটতে খুব পছন্দ করত। এবার তিনজন মানুষের কেউই নেই। খুব মন খারাপ হয়। আজ বিকেলে বসে বসে তাই ভাবছিলাম, জীবন এভাবেই পার হয়ে যায়। এই দিনে তিনজনের কথা খুব মনে পড়বে।’
জীবন নিয়ে ফেরদৌসী রহমান অনেক খুশি। জানালেন জীবন নিয়ে উপলব্ধির কথাও। ফেরদৌসী রহমান বললেন, ‘যদি কেউ জীবনকে সুখ হিসেবে মনে করে, তাহলে উদ্যাপনের। আবার কেউ যদি ভাবে এটা পানিশমেন্টের, তাহলে পানিশমেন্টের। পুরোপুরি নির্ভর করছে, কীভাবে জীবনটাকে দেখা হচ্ছে। প্রতিটি দিন যদি কারও কাছে সুন্দর হয়, তাহলে এটা অবশ্যই উদ্যাপনের। অন্যদিকে প্রতিটি দিন যদি কারও কাছে কষ্টের হয়, তাহলে এটা পানিশমেন্টের। তবে আমি মনে করি, জীবনটা হচ্ছে সুখ-দুঃখের একটা মিশ্রণ। ভালো-মন্দ মিলিয়েই জীবন। কারও একটু বেশি ভালো, কারও একটু কম খারাপ।’



