দক্ষিণ এশিয়ায় চতুর্থ শান্তিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ

গ্লোবাল পিস ইনডেক্স (জিপিআই) ২০২৬-এ দক্ষিণ এশিয়ার চতুর্থ শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ। সর্বশেষ সূচকে ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে পেছনে ফেলে এগিয়েছে দেশটি। তবে জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জের বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস (আইইপি) গত ৯ জুন এ সূচক প্রকাশ করে। ১৬৩টি দেশ ও ভূখণ্ডের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৭তম। ৫-এর মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ২ দশমিক ২২৬, যা দেশটিকে ‘মাঝারি’ শান্তিপূর্ণ দেশের কাতারে রেখেছে।
প্রতিবছরের মতো এবারও সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা, চলমান অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সংঘাত এবং সামরিকীকরণ—এই তিনটি প্রধান সূচকের ভিত্তিতে শান্তির মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্কোর যথাক্রমে ২ দশমিক ৫৭৯, ২ দশমিক ২৩৭ এবং ১ দশমিক ৬১৫।
দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশের অবস্থান ধরে রেখেছে ভুটান। বৈশ্বিক তালিকায় দেশটির অবস্থান ১৬তম এবং অঞ্চলটির একমাত্র দেশ হিসেবে তারা ‘উচ্চ’ শান্তির ক্যাটাগরিতে রয়েছে। শ্রীলঙ্কা ও নেপাল যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে। অন্যদিকে ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় পঞ্চম এবং বিশ্বে ১২৭তম স্থানে নেমে গেছে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তান যথাক্রমে ১৫২ ও ১৫৭তম অবস্থানে থেকে অঞ্চলটির সবচেয়ে অশান্ত দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে শান্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবনতি হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায়। অঞ্চলটির গড় শান্তির মান ২ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। বিশেষ করে চলমান সংঘাতের সূচকে অবনতি হয়েছে ৭ দশমিক ১ শতাংশ। এর পেছনে অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা ও সীমান্ত উত্তেজনাকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশের তালিকায় টানা ১৯ বছর ধরে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে আইসল্যান্ড। এরপর রয়েছে নিউজিল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, স্লোভেনিয়া ও আয়ারল্যান্ড। বিপরীতে প্রথমবারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে কম শান্তিপূর্ণ দেশের তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে রাশিয়া। এরপর রয়েছে সুদান, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, ইউক্রেন ও ইসরায়েল।
জিপিআই প্রতিবেদনে বৈশ্বিক শান্তি পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। গত এক বছরে বিশ্বে শান্তির মাত্রা কমেছে ০ দশমিক ৭ শতাংশ। টানা ১২ বছর ধরে এই অবনতি অব্যাহত রয়েছে। মূল্যায়ন করা ১৬৩ দেশের মধ্যে ৯৯টি দেশে শান্তির অবনতি হয়েছে, আর উন্নতি হয়েছে ৬২টি দেশে।
প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক উত্তেজনার প্রভাবেও বাংলাদেশের সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে ইরান-সংক্রান্ত সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এবং হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে দেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। এতে বাংলাদেশের জিডিপির ওপর অতিরিক্ত ১ দশমিক ৫ থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়া এলএনজির উচ্চমূল্য, জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা, খাদ্য নিরাপত্তা সংকট এবং পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশের তালিকায় রাখা হয়েছে। তবে আর্থিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক সংঘাত ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও গভীর হলে দক্ষিণ এশিয়ার আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে, যার প্রভাব থেকে বাংলাদেশও পুরোপুরি মুক্ত থাকবে না।



