বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬
নারী

এক চুম্বনেই বদলে গেল স্প্যানিশ ফুটবল

IMG_1484

নারী ফুটবলের ইতিহাসে ২০২৩ সালের বিশ্বকাপ স্পেনের জন্য এক স্বপ্নপূরণের মুহূর্ত। প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে দলটি। তবে এই ঐতিহাসিক জয়ের আনন্দকে ছাপিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে একটি বিতর্কিত চুম্বন, যা শুধু একজন ফুটবলারের ব্যক্তিগত সীমারেখা লঙ্ঘন করেনি, বরং ক্রীড়া প্রশাসনে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নারীদের প্রতি আচরণ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দেয়।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর নেটফ্লিক্সে মুক্তি পায় তথ্যচিত্র ‘ইটস অল ওভার: দ্য কিস দ্যাট চেঞ্জড স্প্যানিশ ফুটবল’।

২০২৩ নারী বিশ্বকাপের ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন। ট্রফি বিতরণ অনুষ্ঠানে খেলোয়াড়দের গলায় পদক পরিয়ে দিচ্ছিলেন স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের তৎকালীন সভাপতি লুইস রুবিয়ালেস। সেই সময় তিনি দলের তারকা ফুটবলার হেনি হেরমোসোকে জড়িয়ে ধরে তার ঠোঁটে চুমু খান। ঘটনাটি ক্যামেরায় ধরা পড়ার পর মুহূর্তেই তা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

পরবর্তীতে ইনস্টাগ্রাম লাইভে হেনি হেরমোসো জানান, ওই চুম্বন ছিল তার অনিচ্ছাকৃত এবং তিনি এটি পছন্দ করেননি। এরপরই শুরু হয় বিতর্ক, প্রতিবাদ এবং জবাবদিহির দাবি।

এই ঘটনার প্রতিবাদে সামনে আসে ‘সে আকাবো’ স্লোগান, যার অর্থ ‘এবার শেষ’ বা ‘আর নয়’। দলের অন্যতম তারকা ফুটবলার অ্যালেক্সিয়া পুতেলাস প্রথম এই স্লোগান ব্যবহার করেন। তিনি এবং তার সতীর্থরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ফুটবল ফেডারেশনের নেতৃত্বে পরিবর্তন না এলে তারা জাতীয় দলে ফিরবেন না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ‘সে আকাবো’ হ্যাশট্যাগ। শুধু ফুটবলাররাই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্রীড়াবিদ, জাতিসংঘ, স্পেন সরকার এবং সাধারণ মানুষও এই আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে। একটি চুম্বনের ঘটনা ধীরে ধীরে নারীদের প্রতি বৈষম্য, হয়রানি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয়।

তথ্যচিত্রটিতে স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী দলের একাধিক সদস্য প্রথমবারের মতো খোলামেলা কথা বলেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন হেনি হেরমোসো, অ্যালেক্সিয়া পুতেলাস, আইতানা বোনমাতি, ওলগা কারমোনা এবং ইভানা আন্দ্রেস। এতে উঠে এসেছে বিশ্বকাপের আগে দলের অস্থির সময়, ফেডারেশনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, টুর্নামেন্টে তাদের সংগ্রাম এবং পরবর্তী আন্দোলনের নেপথ্যের গল্প।

দলের অধিনায়ক ইভানা আন্দ্রেস বলেন, তারা এত কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করেও শেষ পর্যন্ত তাদের সাফল্যের গল্প অন্য কেউ দখল করে নেয়।

তথ্যচিত্রটির পরিচালক হোন্না পারডোসের মতে, খেলোয়াড়রা এমন কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন যা আগে কখনো প্রকাশ্যে আসেনি। তার ভাষায়, এটি শুধু ফুটবলের গল্প নয়, বরং একটি সময়ের দলিল, যা স্পেনের ক্রীড়া ও সামাজিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করেছে।

ঘটনার পর রুবিয়ালেস প্রথমে ক্ষমা চাইতে অস্বীকৃতি জানান এবং পদত্যাগ করবেন না বলে ঘোষণা দেন। পরিস্থিতি আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে যখন তার মা একটি গির্জায় অবস্থান নিয়ে অনশন শুরু করার ঘোষণা দেন। তবে শেষ পর্যন্ত ব্যাপক চাপের মুখে রুবিয়ালেস তার পদ হারান এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেও নিষিদ্ধ হন।

এই তথ্যচিত্র শুধু ফুটবলকে ঘিরে নয়, বরং সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে তুলে ধরে। এটি এমন এক লড়াইয়ের গল্প, যেখানে বিশ্বকাপজয়ী নারীরা তাদের সাফল্যের পাশাপাশি নিজেদের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার জন্যও লড়াই করেছেন। একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা কীভাবে একটি দেশের ক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে, সেটিই তুলে ধরা হয়েছে এই প্রামাণ্যচিত্রে।

নারীফুটবল