বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ৮ জুন, ২০২৬
বিশ্লেষণ

ভূমিকম্প থেকে বেঁচে গেলেও আফটারশকে কেন বাড়ে মৃত্যুঝুঁকি?

ৌৈাীূবহ

ভূমিকম্প থেমে গেছে মানেই বিপদ কেটে গেছে- এমন ধারণা একেবারেই ভুল। অনেক সময় মূল ভূমিকম্পের পর ঘণ্টা, দিন, এমনকি কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত ছোট-বড় কম্পন অনুভূত হতে পারে। এই পরবর্তী কম্পনগুলোকে বলা হয় আফটারশক। যদিও অধিকাংশ আফটারশক মূল ভূমিকম্পের তুলনায় দুর্বল হয়, তবুও ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ধসে পড়া, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া বা অন্যান্য দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে আফটারশকের সময় কী করতে হবে, কী করা যাবে না এবং কীভাবে পরিবারকে নিরাপদ রাখা যায়- এসব বিষয়ে সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


আফটারশক কী?

ভূমিকম্পের সময় ভূগর্ভস্থ শিলাস্তরে যে বিশাল চাপের পরিবর্তন ঘটে, তার ফলে পৃথিবীর অভ্যন্তরে নতুন ভারসাম্য তৈরি হতে কিছু সময় লাগে। এই প্রক্রিয়ায় একাধিক ছোট কম্পন সৃষ্টি হয়, যেগুলোই আফটারশক নামে পরিচিত।
কখনও কখনও আফটারশকের মাত্রাও এত বেশি হতে পারে যে তা দুর্বল বা ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাকে সম্পূর্ণ ধসিয়ে দিতে পারে।

ভূমিকম্পের কতদিন পর আফটার শক হতে পারে?

সাধারণত-

প্রথম ২৪ ঘণ্টায় আফটার শক সবচেয়ে বেশি হয়,

৩ থেকে ৭ দিনের মধ্যে এর পরিমাণ কমতে থাকে,

বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে সপ্তাহ বা মাসব্যাপী আফটার শক অনুভূত হতে পারে।

৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পে সাধারণত কয়েকদিন ছোটখাটো আফটার শক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

আফটার শক কি ভূমিকম্পের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হতে পারে?

সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী আফটার শক মূল ভূমিকম্পের চেয়ে দুর্বল হয়।

আফটারশকের সময় প্রথম করণীয়- যদি আপনি কোনো ভবনের ভেতরে থাকেন এবং আবার কম্পন অনুভব করেন, তাহলে আতঙ্কিত হয়ে দৌড়ানো যাবে না। “ড্রপ, কভার, হোল্ড অন” নীতিটি অনুসরণ করুন –

নিচু হয়ে বসে পড়ুন।
শক্ত টেবিল বা ডেস্কের নিচে আশ্রয় নিন।
একটি হাত দিয়ে মাথা ও ঘাড় ঢেকে রাখুন।
আশ্রয়ের বস্তুটি শক্তভাবে ধরে রাখুন।

অনেকেই কম্পন শুরু হলে সিঁড়ির দিকে দৌড় দেন। কিন্তু এটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি। কারণ সিঁড়ি ভবনের দুর্বল অংশগুলোর মধ্যে অন্যতম।ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে ফিরে যাবেন নামূল ভূমিকম্পের পর যদি কোনো ভবনে ফাটল দেখা যায়, দেয়াল হেলে পড়ে বা কলাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে আফটারশকের সময় বা তার আগে সেই ভবনে প্রবেশ করা উচিত নয়।
ধরা যাক, একটি পাঁচতলা ভবনের কলামে ফাটল দেখা দিয়েছে। প্রথম ভূমিকম্পে ভবনটি টিকে গেলেও পরবর্তী আফটারশকে সেটি ধসে পড়তে পারে। তাই প্রকৌশলী বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে প্রবেশ করা ঝুঁকিপূর্ণ।


খোলা জায়গায় থাকলে কী করবেন?

যদি আপনি ইতোমধ্যে নিরাপদ খোলা স্থানে অবস্থান করেন, তাহলে সেখানেই থাকুন। তবে খেয়াল রাখতে হবে-

  • বিদ্যুতের খুঁটি থেকে দূরে থাকতে হবে।
  • গাছ, বিলবোর্ড বা ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামোর নিচে দাঁড়ানো যাবে না।
  • কাঁচের দেয়ালযুক্ত ভবনের কাছাকাছি যাওয়া উচিত নয়।
  • ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে।
  • অনেক সময় আতঙ্কিত মানুষ একসঙ্গে দৌড়াতে গিয়ে পদদলিত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। তাই শান্ত থাকা অত্যন্ত জরুরি।
    লিফট কখনো ব্যবহার করবেন না
  • ভূমিকম্পের পর বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। আফটারশকের সময় লিফটের যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিতে পারে বা সেটি মাঝপথে আটকে যেতে পারে।তাই ভবন থেকে বের হওয়ার প্রয়োজন হলে কেবল নিরাপদ সিঁড়ি ব্যবহার করতে হবে। তবে কম্পন চলাকালে সিঁড়িতে অবস্থান করাও ঝুঁকিপূর্ণ।
  • গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ পরীক্ষা করুন

ভূমিকম্পের পরে গ্যাস লাইনে লিকেজ, বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে যাওয়া বা পানির পাইপ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
নিচের লক্ষণগুলো দেখলে সতর্ক হোন-

  • গ্যাসের গন্ধ পাওয়া
  • স্পার্ক বা আগুনের ঝলক দেখা
  • পানির পাইপ ফেটে যাওয়া
  • বৈদ্যুতিক তার ঝুলে থাকা, এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিজে মেরামতের চেষ্টা না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে খবর দিন।

জরুরি ব্যাগ প্রস্তুত রাখুন

আফটারশক কয়েকবার হতে পারে। তাই নিরাপদ স্থানে অবস্থান করার সময় একটি জরুরি ব্যাগ সঙ্গে রাখা ভালো।
এই ব্যাগে থাকতে পারে-

  • বিশুদ্ধ পানি
  • শুকনো খাবার
  • টর্চলাইট
  • অতিরিক্ত ব্যাটারি
  • পাওয়ার ব্যাংক
  • প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রী
  • প্রয়োজনীয় ওষুধ
  • গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রের কপি, একটি প্রস্তুত জরুরি ব্যাগ সংকটময় পরিস্থিতিতে অনেক বড় সহায়তা দিতে পারে।

গুজব নয়, তথ্যের ওপর নির্ভর করুন

ভূমিকম্পের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। কেউ বলে আরও বড় ভূমিকম্প আসছে, কেউ আবার ভুয়া সতর্কবার্তা ছড়ায়। বাস্তবে ভূমিকম্পের সুনির্দিষ্ট সময় ও মাত্রা আগে থেকে নির্ভুলভাবে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়। তাই শুধুমাত্র সরকারি সংস্থা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুসরণ করুন।আফটারশকের সময় শিশু ও বয়স্করা বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়তে পারেন। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কেউ যদি শারীরিকভাবে অক্ষম হন, তাহলে আগে থেকেই তাদের জন্য একটি নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরি রাখুন। শিশুদের সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলুন কী করতে হবে। বৃদ্ধদের প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সহায়ক সরঞ্জাম হাতের কাছে রাখুন।

বাংলাদেশে কেন সচেতনতা জরুরি?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত। রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে ঘনবসতি এবং অনেক পুরোনো ভবন থাকায় আফটারশকের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। তাই শুধু ভূমিকম্পের সময় নয়, ভূমিকম্প-পরবর্তী সময়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে মূল কম্পনের চেয়ে আফটারশকের সময় মানুষের অসতর্কতাই বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ভূমিকম্পের পর আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও প্রস্তুতি। আফটারশক স্বাভাবিক একটি ভূতাত্ত্বিক ঘটনা, তবে এটি অবহেলার বিষয় নয়। কম্পন থেমে যাওয়ার পরও ঝুঁকি থেকে যেতে পারে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত ভবন এড়িয়ে চলা, নিরাপদ স্থানে থাকা, জরুরি সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুসরণ করাই হতে পারে জীবন রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
মনে রাখবেন, একটি সঠিক সিদ্ধান্ত এবং কয়েক সেকেন্ডের সচেতনতা আপনার ও আপনার পরিবারের জীবন বাঁচাতে পারে।

আফটারশকবাংলাদেশভূমিকম্পমৃত্যুঝুঁকি