বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ১ জুন, ২০২৬
বিনোদন

ঢাকার মেয়ে সুমন কল্যাণপুরের শেষ বিদায়, শোক সংগীতাঙ্গনে

1780262230_suman-1280

ভারতের প্রখ্যাত প্লেব্যাক গায়িকা সুমন কল্যাণপুর আর নেই। ঢাকায় জন্ম নেওয়ার পাশাপাশি উপমহাদেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এক অনন্য কণ্ঠের অধিকারী ছিলেন তিনি। রবিবার (৩১ জুন) মুম্বাইয়ের নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর।

‘আজকাল তেরে মেরে প্যায়ার কে চর্চে’, ‘না না করতে প্যায়ার তুমহি সে’, ‘তুমনে পুকারা অউর হাম চলে আয়ে’ কিংবা বাংলা শ্রোতাদের হৃদয়ে গেঁথে থাকা ‘মনে করো আমি নেই’, ‘বসন্ত এসে গেছে’- এমন অসংখ্য কালজয়ী গান দিয়ে কয়েক দশক ধরে তিনি মুগ্ধ করে রেখেছিলেন শ্রোতাদের।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন তিনি। প্রায় এক মাসের বেশি সময় ধরে বার্ধক্যজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন। স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় তিনি শান্তিপূর্ণভাবে মৃত্যুবরণ করেন।

সুমন কল্যাণপুর জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৭ সালের ২৮ জানুয়ারি, অবিভক্ত বাংলার ঢাকায়। তার আসল পদবি ছিল হেমাডি। তাঁর বাবা শঙ্কর রাও হেমাডি ব্যাংকের চাকরির সূত্রে দীর্ঘদিন ঢাকায় কর্মরত ছিলেন। ১৯৪৩ সালে পরিবারসহ তিনি তৎকালীন বোম্বেতে (বর্তমান মুম্বাই) চলে যান, সেখানেই সুমনের বেড়ে ওঠা।

পাঁচ বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সুমন ছিলেন সবার বড়। শৈশবে তার গায়িকা হওয়ার কোনো স্বপ্ন ছিল না। বরং ছবি আঁকা, সেলাই করা এবং বাগান পরিচর্যায় বেশি আগ্রহ ছিল তার। এই আগ্রহ থেকেই পরবর্তী সময়ে তিনি স্যার জে জে স্কুল অব আর্টসে ভর্তি হন।

কৈশোরে নূরজাহানের গান শুনে সংগীতের প্রতি তার আগ্রহ জন্মায়। এরপর স্কুল ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত গান গাইতে শুরু করেন তিনি। এমনই এক অনুষ্ঠানে তার কণ্ঠে মুগ্ধ হন খ্যাতিমান মারাঠি সংগীত পরিচালক কেশবরাও ভোলে। তিনিই সুমনের প্রতিভা দেখে তার মা–বাবাকে সংগীতচর্চা অব্যাহত রাখার পরামর্শ দেন এবং নিজেই তাকে তালিম দেওয়া শুরু করেন। কেশবরাও ভোলে বুঝেছিলেন, সুমনের কণ্ঠ লাইট মিউজিকের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী।

তার হাত ধরেই ধীরে ধীরে পেশাদার সংগীতজগতে প্রবেশ করেন সুমন। ১৯৫২ সালে তিনি প্রথম আকাশবাণীতে গান করেন। এরপর ১৯৫৩ সালে মারাঠি চলচ্চিত্র ‘শুকরচি চাঁদনি’তে প্লেব্যাক করেন। পরের বছর, ১৯৫৪ সালে ‘মঙ্গু’ ছবির মাধ্যমে তার হিন্দি চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক যাত্রার সূচনা হয়।

শাস্ত্রীয় সংগীতেও অনায়াস বিচরণ ছিল সুমন কল্যাণপুর-এর। রাগাশ্রয়ী গানে পারদর্শিতার জন্য তিনি তিনবার ‘সুর শ্রীনগর সংসদ’ সম্মানে ভূষিত হন। ২০০৯ সালে মহারাষ্ট্র সরকার তাকে ‘লতা মঙ্গেশকর পুরস্কার’ প্রদান করে। পরে ২০২৩ সালে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মভূষণ’- এ ভূষিত হন এই কিংবদন্তি শিল্পী।

তার মৃত্যুতে ভারতের সংগীতাঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ব্যক্তিত্বরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করেছেন। এনসিপি (এসপি) নেতা শারদ পাওয়ার এক্সে লিখেছেন, তার মিষ্টি, সুমধুর ও হৃদয়স্পর্শী কণ্ঠ ভারতীয় সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে বলেন, তার সুরেলা কণ্ঠ ভারতীয় সংগীত ও চলচ্চিত্র জগতে বিশেষ অবদান রেখে গেছে।

তবে সংগীতপ্রেমীদের কাছে সুমন কল্যাণপুর হয়তো চিরকালই বেঁচে থাকবেন তার অমলিন, কালজয়ী গানগুলোর মধ্য দিয়ে।

আজকাল তেরে মেরে প্যায়ার কে চর্চেমৃত্যুবরণসংগীতসুমন কল্যাণপুর