বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ২৫ মে, ২০২৬
সাহিত্য-সংস্কৃতি

নজরুলের নারীভাবনাঃ সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা এক চিন্তা

images

“বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর”-

কাজী নজরুল ইসলামের এই বিখ্যাত পঙক্তিটির সাথে নিশ্চয়ই আপনারা কম-বেশি সকলেই পরিচিত। সমাজ যখন নারীদের শুধু ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখতে চেয়েছিল, তখন নজরুল নারীকে সম্মান, স্বাধীনতা ও সমঅধিকারের চোখে দেখার আহ্বান করেছিলেন। তার কলমে নারী কখনো বিদ্রোহ, কখনো ভালোবাসা, কখনো মুক্তির প্রতীক। আজ নজরুলের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে নজরুলের কিছু নারী বিষয়ক সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।

নারী ও পুরুষ একে অপরের পরিপূরক- এই ধারণা থেকে তিনি লিখেছেন বিখ্যাত কবিতা নারী। “বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর”, এই পঙক্তিটি নারী কবিতারই অন্তর্গত একটি অংশ। নজরুলের ভাবনায় নারী মানে শুধু মমতা নয়, শক্তিও। তিনি মনে করতেন, পৃথিবীর ইতিহাসে যত মহান সৃষ্টি, সংগ্রাম ও সাফল্য আছে-তার প্রতিটি অধ্যায়ে নারীর অবদান জড়িয়ে আছে। পুরুষের পাশাপাশি নারীও সমানভাবে সভ্যতা নির্মাণের অংশীদার—এই প্রগতিশীল চিন্তাই তাঁর সাহিত্যকে করেছে ব্যতিক্রম।

নজরুলের অন্যতম কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ সাম্যবাদী যেখানে তিনি মূলত মানবতা, সাম্য এবং অসাম্প্রদায়িকতার কথা তুলে ধরেছেন। এখানে ধর্ম, জাত, লিঙ্গ- সব বিভাজনের বিরুদ্ধে মানবতার কথা বলা হয়েছে। মানুষের সম্প্রদায়ের চেয়েও তার বড় পরিচয় সে মানুষ। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ দূর করার আহ্বান এই কবিতার মূল বিষয়। নারী-পুরুষ যে সমান মর্যাদার অধিকারী স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে এই কবিতায়।

নজরুলের ‘বারাঙ্গনা’ কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সাহসী রচনা হিসেবে ধরা হয়। যে সময়ে সমাজ পতিতালয়ের নারীদের ঘৃণা ও অবহেলার চোখে দেখত, সেই সময় নজরুল তাদের পক্ষেই কথা বলেছিলেন। নজরুলের কলম পতিতালয়ের দরজায় দাঁড়িয়ে প্রথমবারের মতো বলেছিল-এই নারীরও সম্মান আছে, অধিকার আছে, মানুষ হিসেবে বাঁচার অধিকার আছে। সমাজ যেখানে ‘বারাঙ্গনা’ শব্দে অপমান খুঁজেছে, নজরুল সেখানে খুঁজেছেন একজন মানুষের দুঃখ। এই কবিতায় নজরুল নারীদের বিচার করেননি; বরং সমাজের ভণ্ডামিকে আঘাত করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নিজের ভুল ঢাকতে নারীকেই দোষী বানায়। অথচ সেই নারীরও আছে অনুভূতি, স্বপ্ন ও সম্মানের অধিকার।

নজরুলের চন্দ্রবিন্দু একটি ব্যঙ্গাত্মক কাব্যগ্রন্থ, যেখানে তিনি সমাজের নানা ভণ্ডামি, কুসংস্কার এবং বিশেষ করে নারী-পুরুষ বৈষম্যকে তীব্রভাবে আঘাত করেছেন। ব্যঙ্গ ও রসের মাধ্যমে সমাজের ভেতরের অসংগতি তুলে ধরেছেন। তখনকার সমাজে নারীদের নিয়ে যে দ্বিমুখী মানসিকতা ছিল-একদিকে সম্মানের কথা বলা, অন্যদিকে বাস্তবে অবহেলা ও দমন—সেই ভণ্ডামিকেই তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

নজরুলের লেখায় নারী কখনো মা, কখনো প্রেমিকা, কখনো সংগ্রামী যোদ্ধা। তিনি নারীর আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। সমাজে নারীর প্রতি অন্যায়, কুসংস্কার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ করেছেন তাঁর কবিতা, গান ও প্রবন্ধের মাধ্যমে। বর্তমান যুগেও নজরুলের নারীভাবনা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক এবং অনুপ্রেরণাদায়ক।

জয়ন্তীনজরুলনারী