মৃ/ত্যুকে হার মানানো মেরি: এক কিশোরীর অবিশ্বাস্য বেঁচে ফেরার গল্প
১৯৭৮ সালের এক ভয়াবহ সন্ধ্যা। যুক্তরাষ্ট্রের California-এর রাস্তা ধরে হিচহাইকিং করছিল ১৫ বছর বয়সী কিশোরী মেরি ভিনসেন্ট। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়া সেই কিশোরী হ...

১৯৭৮ সালের এক ভয়াবহ সন্ধ্যা। যুক্তরাষ্ট্রের California-এর রাস্তা ধরে হিচহাইকিং করছিল ১৫ বছর বয়সী কিশোরী মেরি ভিনসেন্ট। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়া সেই কিশোরী হয়তো ভাবতেই পারেননি, সামনে অপেক্ষা করছে এমন এক বিভীষিকা, যা একসময় পুরো আমেরিকাকে নাড়িয়ে দেবে।
রাস্তার পাশে গাড়ি থামান ৫১ বছর বয়সী লরেন্স সিঙ্গেলটন। স্বভাবের একজন সাধারণ মানুষের মতোই নিজেকে উপস্থাপন করেন তিনি। ক্লান্ত ও বিপদহীন একটি যাত্রার আশায় মেরি গাড়িতে ওঠেন। কিন্তু খুব দ্রুতই তিনি বুঝতে পারেন, ভুল মানুষের ওপর বিশ্বাস করেছেন।
সিঙ্গেলটন তাকে একটি নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে কিশোরী মেরির ওপর চালানো হয় ভয়াবহ নির্যাতন। পরে কুঠার দিয়ে তার দুই হাতের নিচের অংশ কেটে ফেলে দেওয়া হয়। এখানেই শেষ নয়—মেরিকে প্রায় ৩০ ফুট উঁচু পাহাড় থেকে নিচে ছুড়ে ফেলে রেখে চলে যায় সিঙ্গেলটন, যেন নিশ্চিত মৃত্যু হয় তার। যে পরিস্থিতিতে সাধারণ একজন মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা প্রায় অসম্ভব, সেই পরিস্থিতিতেই শুরু হয় মেরি ভিনসেন্টের অবিশ্বাস্য লড়াই।

গভীর রাতে, রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলেন তিনি। শরীর থেকে দ্রুত রক্ত বেরিয়ে যাচ্ছিল। মৃত্যুকে সামনে দেখতে পাচ্ছিলেন কিশোরীটি। কিন্তু হাল ছাড়েননি। নিজের কাটা হাতের অংশ কাদা দিয়ে চেপে ধরে রক্তক্ষরণ কমানোর চেষ্টা করেন তিনি। এরপর অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়েও পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করেন।
ভাবা যায়? দুই হাতের নিচের অংশ নেই, শরীর ভয়াবহভাবে আহত, সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ হেঁটে সাহায্যের খোঁজ করেন তিনি। অবশেষে কয়েকজন পথচারী তাকে দেখতে পান এবং হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা পরে বলেন, এত ভয়াবহ অবস্থার পরও তার বেঁচে থাকা ছিল প্রায় অলৌকিক। হাসপাতালে দীর্ঘ চিকিৎসা চলে মেরির। কৃত্রিম হাত লাগানো হয় তার শরীরে। কিন্তু শারীরিক ক্ষতের চেয়েও গভীর ছিল মানসিক ট্রমা। তবু ভেঙে পড়েননি তিনি। বরং আদালতে দাঁড়িয়ে নিজের ওপর হওয়া বর্বরতার বর্ণনা দেন।
সেই দৃশ্য আমেরিকার মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আদালতে দাঁড়িয়ে কৃত্রিম হাত পরা এক কিশোরী নিজের নির্যাতনের কথা বলছে—এটি পরিণত হয়েছিল সাহস ও বেঁচে থাকার প্রতীকে। ঘটনার পর গ্রেপ্তার করা হয় লরেন্স সিঙ্গেলটনকে। কিন্তু বিচার শেষে যে রায় আসে, তা পুরো যুক্তরাষ্ট্রকে হতবাক করে দেয়।
মাত্র আট বছরের কারাদণ্ড
এমন ভয়ংকর অপরাধের জন্য এত কম সাজা কেন—এই প্রশ্নে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। পরে জানা যায়, সে সময় California-এর আইন অনুযায়ী বিচারকের হাতে খুব বেশি সুযোগ ছিল না। বিচারক নিজেও নাকি অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে কঠোর শাস্তি দিতে পারেননি। সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় ছিল, ভালো আচরণের কারণে সিঙ্গেলটন আরও দ্রুত মুক্তি পেয়ে যায়।
এই মুক্তিই পরে নতুন আতঙ্কের জন্ম দেয়

১৯৯৭ সালে আবারও এক নারীকে হত্যা করে সিঙ্গেলটন। ভুক্তভোগীর নাম ছিল হাইস। সমালোচকরা তখন বলেন, যদি প্রথম অপরাধের পরই তাকে আজীবন কারাদণ্ড দেওয়া হতো, তাহলে হয়তো আবার একই ঘটনা ঘটতো না।
তবে মেরি ভিনসেণ্ট -এর জীবন কিন্তু থেমে থাকেনি। ভয়াবহ সেই ঘটনার পর তিনি ধীরে ধীরে নতুন জীবন গড়ে তোলেন। একজন শিল্পী হিসেবে কাজ করেন, মোটিভেশনাল বক্তা হন এবং নিজের গল্পের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষকে অনুপ্রাণিত করেন।
তার গল্প শুধু ভয়ংকর অপরাধের বর্ণনা নয়; এটি মানুষের অদম্য মানসিক শক্তিরও গল্প। এমন এক কিশোরীর গল্প, যিনি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলেন নিজের ইচ্ছাশক্তি আর বেঁচে থাকার প্রবল আকাঙ্ক্ষা দিয়ে।
আজও মেরি ভিনসেন্ট এর নাম উচ্চারিত হয় সাহসের প্রতীক হিসেবে। কারণ তিনি শুধু একজন নির্যাতনের শিকার নন—তিনি প্রমাণ করেছিলেন, কখনও কখনও মানুষের বেঁচে থাকার শক্তি সবচেয়ে ভয়ংকর অন্ধকারকেও হার মানাতে পারে।


