হারিয়ে যাওয়া মায়েদের নতুন ঠিকানা- ‘সাড়া মানবিক বৃদ্ধাশ্রম’
ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ি গ্রামের নিরিবিলি পরিবেশে গড়ে উঠা ‘সাড়া মানবিক বৃদ্ধাশ্রম’ অসহায় ও পরিচয়হীন মা-বাবাদের শেষ আশ্রয়স্থল। ২০১৮ সালে ব্যক...

ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ি গ্রামের নিরিবিলি পরিবেশে গড়ে উঠা ‘সাড়া মানবিক বৃদ্ধাশ্রম’ অসহায় ও পরিচয়হীন মা-বাবাদের শেষ আশ্রয়স্থল। ২০১৮ সালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে এটি প্রতিষ্ঠা করেন স্বপ্নবাজ সমাজকর্মী আবদুল মালেক। জেলার ফুলপুর উপজেলার রামভদ্রপুর ইউনিয়নের গজন্দর গ্রামের বাসিন্দা হলেও তিনি ভালুকাতেই গড়ে তুলেছেন এই মানবিক আশ্রয়কেন্দ্র।
রাস্তায় পড়ে ছিলেন কেউ, কেউ ছিলেন হাসপাতালের বারান্দায়। কারও শরীরে পচন ধরেছিল, কারও চোখে ছিল শূন্যতা। নাম নেই, ঠিকানা নেই, পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষও নেই। অথচ একসময় হয়তো এই মানুষগুলোর মমতার ছায়ায় বড় হয়েছে তাদের সন্তানেরা।

বর্তমানে বৃদ্ধাশ্রমটিতে রয়েছেন ২২ জন বৃদ্ধা ও ৫ জন বৃদ্ধ। তাদের সবার পরিচয় অজানা। তবে আশ্রয়কেন্দ্রটিতে শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এসেছেন ৫৭ জন মানুষ। এর মধ্যে ১৭ জন মারা গেছেন এবং পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর ১৩ জন ফিরে গেছেন পরিবারের কাছে।
মা দিবসে যখন অনেকে মায়ের হাত ধরে ছবি তুলছেন, শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, তখন ভালুকার এই আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা অনেক বৃদ্ধ নারীই জানেন না তাদের সন্তানেরা এখন কোথায় আছে। তাদের স্মৃতির অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে সময়ের সঙ্গে। পরিচয়হীন এই মানুষগুলোর কাছে এখন এই বৃদ্ধাশ্রমই পরিবার। আর সেবাযত্ন করা মানুষগুলোর মুখেই খুঁজে পান আপনজনের ছায়া।
বৃদ্ধাশ্রমটিতে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন বৃদ্ধ চুপচাপ চেয়ারে বসে আছেন। কেউ দূরে তাকিয়ে, কেউ আবার অস্পষ্টভাবে কিছু বলার চেষ্টা করছেন। তাদের পাশে ঘুরে ঘুরে খোঁজখবর নিচ্ছেন আবদুল মালেক। এখানকার কেউ উদ্ধার হয়েছেন রাস্তা থেকে, কেউ এসেছেন সরকারি হাসপাতালের বারান্দা পেরিয়ে। তাদের অতীতের গল্প জানে না কেউ। অধিকাংশ বৃদ্ধ-বৃদ্ধাই শারীরিক ও মানসিক দুর্বলতার কারণে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথাও বলতে পারেননি।
আশ্রয়কেন্দ্রটির সূচনালগ্ন থেকেই কাজ করছেন ২৪ বছর বয়সী জেরিন আক্তার (রিয়া)। বৃদ্ধ মানুষগুলোর সেবাযত্নই এখন তার জীবনের বড় দায়িত্ব।

রিয়া বলেন, এখানে থাকা বৃদ্ধ মানুষ গুলোকে গোসল করাই, খাবার দেই এবং তাদের প্রস্রাব-পায়খানাও পরিষ্কার করি। আমার মা নেই, এই মানুষ গুলোকেই মা-বাবা মনে করে সেবা করি।
বৃদ্ধাশ্রমটির প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক আবদুল মালেক জানান, ঢাকায় পথশিশুদের নিয়ে কাজ করার সময় থেকেই মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধ মানুষদের জন্য কিছু করার চিন্তা মাথায় আসে তার। তিনি বলেন, আমি যখন ঢাকায় পথশিশু নিয়ে কাজ করতাম তখন রেলস্টেশনে মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধ মানুষ দেখে এদের নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা শুরু হয়। যে সব মানুষ মানসিক ভারসাম্যহীন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাস্তায় জীবন যাপন করে শুধুমাত্র তাদের জন্য দেশে বৃদ্ধাশ্রম খুবই কম। সে সব মানুষ গুলোর জন্যই ২০১৮ সালে ব্যক্তিগত অর্থায়নে এটি শুরু করা হয়।
তিনি আরও বলেন, আমরা যাদের লালনপালন করি তারা সবাই মানসিক ভারসাম্যহীন। অনেক সময় বাস স্টেশন, রেলস্টেশন, বিভিন্ন হাসপাতাল, সমাজসেবা অফিস থেকে কিংবা থানা থেকে পাঠায়। আমাদের এখানে আসার পর তাদের চিকিৎসা করা হয়। তারা যখন রাস্তায় পড়ে থাকে তখন শরীরে পচন ধরে যায়, সেগুলো সারিয়ে তোলা হয়। এসব মানুষকে নিজের মা-বাবার মতো সেবা করি।
ভালুকা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রুবেল মন্ডল বলেন, যারা অসুস্থ অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকে তাদের এখানে এনে পারিবারিক পরিবেশে সেবা-যত্ন করে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়। কেন্দ্রটির এই মহতী কার্যক্রম অব্যাহত থাকুক এবং সমাজসেবা অধিদপ্তর সর্বদাই তাদের সঙ্গে আছে।


