হিট স্ট্রোকের আগে শরীর যেসব সংকেত দেয় : সাবধানতা ও করণীয়

শরীর কখনো হঠাৎ করে ভেঙে পড়ে না, তার আগেই দেয় নানা সতর্কবার্তা। বিশেষ করে প্রচণ্ড গরমে এই সংকেতগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু অনেক সময় আমরা এগুলোকে সাধারণ ক্লান্তি বা সাময়িক অসুস্থতা ভেবে এড়িয়ে যাই। ফলে অজান্তেই বাড়তে থাকে বড় বিপদের ঝুঁকি। মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, দুর্বলতা কিংবা অস্বাভাবিক ঘাম এসবই হতে পারে গুরুতর অবস্থার আগাম ইঙ্গিত। তাই শরীরের এসব সংকেতকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি, কারণ সময়মতো সচেতন হলে বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব।
হিট স্ট্রোক কী?
প্রচণ্ড গরমে হিট স্ট্রোক খুবই সাধারণ সমস্যা। তখন হঠাৎ করেই শরীরের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। রক্তনালি প্রসারিত হয়ে যায়। অতিরিক্ত তাপমাত্রা শরীর থেকে বেরোতে পারে না। স্বাভাবিক ভাবেই রোগীর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কাজ করা বন্ধ করে দেয়। অনেক সময়ে রোগী অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারে।

হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তি এলোমেলো কথা বলতে পারেন। অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন। তাঁর খিঁচুনি হতে পারে। শরীর একেবারে ঘামহীন হয়ে যেতে পারে। হৃৎপিণ্ড অস্বাভাবিক ছন্দে স্পন্দিত হতে পারে। লিভার, কিডনি, মাংসপেশিসহ দেহের নানান অংশের ক্ষতি হতে পারে। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না হলে এর কারণে মৃত্যুও হতে পারে।
হিট স্ট্রোকের আগের সতর্কবার্তা –
শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে কাজ করা কমিয়ে দিলে কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে, যেগুলো অনেকেই গুরুত্ব দেন না। যেমন হালকা মাথাব্যথা বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি—অনেকে এগুলোকে ঘুমের অভাব বা সাধারণ দুর্বলতা ভেবে এড়িয়ে যান, ফলে সময়মতো সতর্ক হওয়া হয় না।
- অতিরিক্ত গরমে শরীর দুর্বল ও অবসন্ন লাগে। বমিভাব দেখা দিতে পারে, এমনকি বমিও হতে পারে। মাথা ঘোরা, ঝিমঝিম করা বা মাথা হালকা লাগাও সাধারণ লক্ষণ।
- এ সময় মনোযোগ কমে যায়, কাজের আগ্রহ কমে এবং বিরক্তি বাড়ে। পেটে অস্বস্তি বা পেশিতে টান ধরতে পারে। অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, শরীর গরম হয়ে যাওয়া এবং ত্বক লালচে হয়ে ওঠাও লক্ষ্য করা যায়।
- হৃদস্পন্দন ও শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি মুখ ও গলা শুকিয়ে যাওয়া, তীব্র পিপাসা—এসব পানিশূন্যতার ইঙ্গিত দেয়। প্রস্রাব কম হওয়া এবং রং গাঢ় হয়ে যাওয়া এই অবস্থার আরেকটি লক্ষণ।
হিটস্ট্রোক হলে কি করতে হবে?
হিট স্ট্রোক একটি মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি বা জরুরি অবস্থা। হিট স্ট্রোকের আগের এসব উপসর্গকে তাই গুরুত্ব দিতে হবে। এসব দেখা গেলে দ্রুততম সময়ে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। কালক্ষেপণ না করে তক্ষুনি হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। হিট স্ট্রোক হলে মানুষের ঘেমে যাওয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
যদি চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে বা নিকটস্থ হাসপাতালে যেতে দেরি হয় তবে –
- আক্রান্ত ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব ঠান্ডা জায়গায় নিয়ে যেতে হবে।
- শুইয়ে দিতে হবে এবং তার পা কিছুটা ওপরে তুলে দিতে হবে।
- প্রচুর পানি বা পানীয় খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে, খাবার স্যালাইন বা ডাবের পানি এ ক্ষেত্রে অগ্রগন্য।
- আক্রান্ত ব্যক্তির ত্বক ঠান্ডা করার ব্যবস্থা করতে হবে, ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর ঘন ঘন মুছে দেওয়া বা স্পঞ্জিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে । বগলের নিচে এবং ঘাড়ে গলায় ঠান্ডা পানি দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
- বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে, হাতপাখা বা ছোট ফ্যান ব্যবহার করা যেতে পারে। আঁটসাঁট পোশাক ঢিলা করা বা কিছুটা খুলে দেওয়া উচিত, যেন শরীরে বাতাস লাগে।
হিট স্ট্রোক প্রতিরোধে প্রয়োজন সচেতনতা-

- বাইরে বের হলে ছাতা ও পানি সঙ্গে রাখুন। প্রয়োজনে ছোট পাখা ব্যবহার করতে পারেন। মুখে পানি দেওয়া এবং ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছলে আরাম পাওয়া যায়।
- অতিরিক্ত ঘাম হলে সামান্য লবণ মেশানো পানীয়, ওরস্যালাইন বা ইলেকট্রোলাইট ড্রিংক খাওয়া উচিত।
- পানির জন্য প্লাস্টিকের বোতলের বদলে থার্মোফ্লাস্ক ব্যবহার করলে পানি দীর্ঘ সময় ঠান্ডা থাকে। বোতলে আগে কিছু বরফ দিলে তা আরও কার্যকর হয়।
- হালকা রঙের, ঢিলেঢালা পোশাক পরুন যাতে বাতাস চলাচল করতে পারে। রোদের সময় বাইরে না যাওয়াই ভালো। প্রয়োজনে কাজের সময়সূচি এমনভাবে ঠিক করুন, যাতে তীব্র গরম এড়িয়ে চলা যায়।
- খাবারের ক্ষেত্রেও সচেতনতা জরুরি। ভারী ও তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে পানি সমৃদ্ধ খাবার বেছে নিন। ফলমূল, সবজি, ঝোলযুক্ত খাবার ও পাতলা ডাল শরীরকে হাইড্রেট রাখতে সাহায্য করে।
- শিশুদের রোদে অতিরিক্ত দৌড়ঝাঁপ করতে নিরুৎসাহিত করুন। যাদের পানি গ্রহণে সীমাবদ্ধতা আছে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- চা, কফি বা ক্যাফেইন কিছুটা মূত্রবর্ধকের কাজ করে থাকে। অতিরিক্ত ঘাম থেকে পানিশূন্যতা দেখা দেয়, বেশি মাত্রায় প্রস্রাব হলে তা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এজন্য গরমে চা পান না করাই শ্রেয়।
সচেতনতা ও সামান্য যত্নই পারে হিট স্ট্রোকের মতো মারাত্মক ঝুঁকি থেকে আপনাকে এবং আপনার প্রিয়জনদের সুরক্ষিত রাখতে।



