বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬
সাহিত্য-সংস্কৃতি

হেলাল হাফিজ: অল্প লিখে গল্প হওয়া মানুষ

hafiz

একাকীত্বের কবি হেলাল হাফিজের জন্ম ১৯৪৮ সালের ৭ অক্টোবর নেত্রকোনায়। এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়, এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়—ষাটের দশকের শেষে লিখেছিলেন কবি হেলাল হাফিজ। তার প্রথম বই ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ এর এই প্রথম কবিতা ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিকে খ্যাতি এনে দেয়। ৫৬ টি অনতিবৃহৎ কবিতা নিয়ে সাজানো এই বইটি। প্রেম ও দ্রোহের এই কাব্যগ্রন্থে স্থান পেয়েছে ১৯৭১ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত লেখা কবিতা। যুদ্ধ, নারী, প্রেম, হতাশা, সুখ-দুঃখ এবং সভ্যতার উপাদানে প্রতিটি কবিতা হয়ে উঠেছে সহজ অথচ ধারালো সৃষ্টি। ‘অগ্ন্যুৎসব’, ‘অস্ত্র সমর্পণ’, ‘ইদানীং জীবন যাপন’, ‘একটি পতাকা পেলে’, ‘ঘরোয়া রাজনীতি’ কবিতায় উঠে এসেছে সমাজ, দেশ ও রাজনীতি নিয়ে গভীর অনুভূতি, দেশপ্রেমের প্রকৃত স্বরূপ।

স্বদেশপ্রেমের সমান্তরালে এ বইয়ের কবিতাতে উঠে এসেছে নারীর প্রতি বন্দনা। প্রিয়তমার সতীন হিসেবে স্বাধীনতাকামী স্বদেশকে কবি কল্পনা করেছেন যেমন, তেমনি নারীকে একইভাবে বর্ণনা করেছেন প্রেমের প্রতিমা, প্রণয়ের তীর্থ হিসেবে। দুঃখবিলাসী কবি ‘দুঃখের আরেক নাম’ কবিতায় লিখেছেন — দুঃখের আরেক নাম হেলাল হাফিজ। পৃথিবীর তিনভাগ সমান দুচোখ যার/তাকে কেন একমাস শ্রাবণ দেখালে, ‘তীর্থ’ কবিতার এই লাইনের মাধ্যমে সুতীব্রভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে দহনের সৌন্দর্য। কোনো প্রাপ্তিই পূর্ণ প্রাপ্তিই নয় —এর মতন পঙক্তি খুব সাবলীলভাবে প্রকাশ করে মানবের চিরায়ত মনস্তত্ত্ব।

‘কোমল কংক্রিট’, ‘ক্যাকটাস’, ‘নিখুঁত ট্রাজেডী’, ‘ভূমিহীন কৃষকের গান’, ‘উপসংহার’ নাম্নী এই বইয়ের কবিতাগুলো আধুনিক কাব্যধারার যোগ্য প্রতিনিধি। ‘সম্প্রদান’, ‘হিরণবালা’, ‘তুমি ডাক দিলে’, ‘তোমাকে চাই’, ‘পৃথক পাহাড়’, ‘প্রস্থান’ কবিতায় মানসীর প্রতি কবি তার প্রেমের সাক্ষর রেখেছেন শব্দের পর শব্দ বুনে। এই বইতে হেলেন নামের এক তরুণীকে পাঠক পেয়েছে রহস্যে মোড়া এক মানবী হিসেবে, কবির চিত্রপটে যাকে নিয়ে কবি খেলতে চেয়েছেন আগুনের হোলি খেলা। বিচ্ছেদের সাথে সন্ধি করা মানুষ এই বইটিতে নিজের অনুভূতিকে খুঁজে পাবে — ভালবাসা যাকে খায়,এইভাবে সবটুকু খায়, এর মত অসংখ্য লাইন। সভ্যতার বিধ্বংসী রূপকে হেলাল হাফিজ এঁকে ফেলছেন মাত্র ছয় শব্দে। নিউট্রন বোমা বোঝ/ মানুষ বোঝ না —এর মত আরও অসাধারণ কিছু লাইন এই বইয়ে পাঠকের অনুভূতিকে কম্পিত করে সহজেই। নিজের কাব্য প্রতিভা আর আবেগের বিশুদ্ধতম পরিস্ফুটন থেকে উৎসারিত এই কবিতাগুলোতে পাঠক কে কবি কতখানি দিয়েছেন তা হেলাল হাফিজেরই লেখা দুটি লাইন দিয়ে বলে এইরকম অসাধারণ দুইটি লাইন দিয়ে —আমি আর কতটুকু পারি?/ এর বেশি পারেনি মানুষ।

যে জলে আগুন জ্বলে বইয়ের সংষ্করণ সংখ্যা ৩৩ এর বেশি। মাত্র একটি কবিতার বই এত অল্প সময়ে এতবার সমসাময়িক সময়ে সংষ্করণ আর হয়নি। এর পরে হেলাল হাফিজ ২০১২ সালে ‘কবিতা ৭১’ এবং ২০১৯ সালে ‘বেদনাকে বলেছি, কেঁদো না’ নামে আরও দুটি কবিতাগ্রন্থ প্রকাশ করেন। তবে সমালোচকদের মতে, দুটো বই–ই তার প্রথম বইয়ের বিস্তরণ। তিনি কবিতার জন্য ২০১৩ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার যখন পান, তৃতীয় বইটি প্রকাশ হওয়ার আগে। দ্বিতীয় বইটিও তেমন সাড়া না জাগালেও বাংলা একাডেমি তাকে তার এই একটি বই ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ এর জন্যই এই স্বীকৃতি দিয়েছে। হেলাল হাফিজ তাই, অল্প লিখে গল্প হওয়া মানুষ!

শেষ জীবনে কবি ছিলেন নিঃসঙ্গ। থাকতেন শাহবাগের সুপার হোস্টেলে। কিছু কবি এবং শুভানুধ্যায়ী ছাড়া তেমন কোন স্বজনের সাথে তার যোগাযোগ ছিল না। ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর হেলাল হাফিজ মারা যান। আর রেখে যান তার নিঃসঙ্গতার সঙ্গী কবিতাকে।

বাংলা একাডেমিযে জলে আগুন জ্বলেহেলাল হাফিজ