বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনমঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬
খাবার-দাবার

১১ বছরের পেশাজীবনের বৈষম্যের অভিজ্ঞতা জানালেন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি শেফ নাদিয়া হোসেন

Nadiya

প্রথাগত চিন্তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজের মতো করে কথা বলার সাহস খুব কম মিডিয়া ব্যক্তিত্বই দেখান। তবে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ শেফ নাদিয়া হোসেন সম্প্রতি ব্যতিক্রমী এক অবস্থান নিয়েছেন। ১১ বছরের পেশাজীবনে কাজের ক্ষেত্রে বৈষম্য, কম পারিশ্রমিক এবং গ্যাসলাইটিংয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর সঙ্গে। সেখান থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী তার অভিজ্ঞতার কিছু অংশ তুলে ধরা হলো।

খাবার শুধু স্বাস্থ্য নয়, আনন্দ ও


ওজন কমানোর বর্তমান জনপ্রিয় ধারায় আমিষকেন্দ্রিক ডায়েট, ইনজেকশন এবং চিনি-বিরোধী চিন্তা বেশ আলোচনায়। ঠিক এই সময় নাদিয়ার নতুন বই ‘নাদিয়াস কুইক কমফোর্টস’ নজর কাড়ে ভিন্ন কারণে।
এই বইয়ে রয়েছে সোনালি সিরাপ দেওয়া ডাম্পলিংস, তেলে ডোবানো মচমচে ভাজা খাবার এবং চিজ বল থেকে শুরু করে ডিপ-ফ্রায়েড ক্যানেলোনির মতো নানা রেসিপি। নাদিয়ার মতে, খাবার শুধু স্বাস্থ্য বা সংখ্যার হিসাব নয়—এটি আনন্দ, স্বাদ ও স্বস্তির বিষয়।

তিনি বলেন, ‘আমি যদি শুধু ডিপ ফ্রাই নিয়েই একটা পুরো বই লিখতে পারতাম, নিশ্চয়ই লিখতাম।’ তবে একই সঙ্গে তিনি জানান, ভারসাম্য জরুরি। তাই বইয়ে যেমন ডিপ-ফ্রায়েড খাবার রয়েছে, তেমনই রয়েছে প্ল্যান্ট-বেজড ডাল ও নুডলসের মতো হালকা রেসিপিও।

বেক অফ থেকে তারকা হয়ে ওঠা

২০১৫ সালে ‘দ্য গ্রেট ব্রিটিশ বেক অফ’-এ অংশ নেওয়ার সময় নাদিয়া ছিলেন নার্ভাস ও শান্ত স্বভাবের একজন নারী। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন সেই সিজনের চ্যাম্পিয়ন। পরবর্তী এক দশকে তিনি কেবল একজন শেফই নন, বরং জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও পরিচিত হয়ে ওঠেন।
এই সময়ে তিনি রান্নার বই প্রকাশ করেছেন, শিশুদের জন্য বই লিখেছেন, টিভি শো করেছেন এবং আরও বড় পরিসরে কাজ করার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল।

সমস্যার সূচনা

গত বছর গ্রীষ্মে নাদিয়া ইনস্টাগ্রামে একটি ভিডিও পোস্ট করে জানান, বিবিসি তাকে নিয়ে আর নতুন কোনো কুকিং শো বানানোর পরিকল্পনা করছে না।
তিনি বলেন, ‘রুজা: আ জার্নি থ্রু ইসলামিক কুজিন ইন্সপায়ার্ড বাই রামাদান অ্যান্ড ঈদ’ বইটির সঙ্গে কোনো টিভি সিরিজ যুক্ত হবে না—এ কথা তিনি ২০২৪ সাল থেকেই জানতেন। পরে জানতে পারেন, ‘নাদিয়াস কুইক কমফোর্টস’ বইটি নিয়েও বিবিসি কোনো সিরিজ তৈরি করবে না।
এই অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে তিনি ইন্ডাস্ট্রিতে চলমান গ্যাসলাইটিং এবং মুসলিম নারী হিসেবে পর্যাপ্ত সমর্থন না পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। যদিও তিনি সরাসরি কাউকে দোষ দেননি।

মুসলিম পরিচয় ও সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে অস্বস্তির কারণ

নাদিয়া জানান, টিভি ও প্রকাশনার দুনিয়ায় একজন ভিন্ন পরিচয়ের মানুষ হিসেবে তিনি পেশাগত একাকিত্ব অনুভব করেছেন। তার মতে, ধর্ম ও সংস্কৃতি তার পরিচয়ের বড় অংশ হলেও সেটিই অনেকের কাছে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, ‘রুজা’ বইটি করার পর তিনি আগের মতো কাজ বা ব্র্যান্ড সহযোগিতা পাচ্ছেন না। তবু তিনি নিজের কাজ নিয়ে গর্বিত।
নাদিয়ার অভিযোগ, ইন্ডাস্ট্রি তাকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে দিয়েছিল, যেখানে তিনি পুরোপুরি নিজের মতো থাকতে পারছিলেন না। মানিয়ে নিতে গিয়ে তিনি নিজের কিছু বিষয় বদলেছেন, এমনকি হিজাব পরার ধরনও পরিবর্তন করেছেন।

বর্ণবাদ ও কম পারিশ্রমিকের অভিজ্ঞতা

নাদিয়া জানান, গায়ের রং নিয়েও তিনি নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। কাজ পাওয়ার জন্য তাকে বারবার ‘কৃতজ্ঞতা’ প্রকাশ করতে হতো। প্রায় সব কাজেই সমালোচনার মুখে পড়েছেন এবং সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করলেও অনেকে তাকে ‘অকৃতজ্ঞ’ বলেছেন।
তিনি আরও বলেন, একই কাজ করলেও তিনি শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় কম পারিশ্রমিক পেয়েছেন। তার মতে, বর্তমানে মানুষ আগের চেয়ে বেশি সাহসী হয়ে মন্তব্য করে এবং বর্ণবাদী মন্তব্যও বেড়েছে। তবে তিনি মনে করেন, নেতিবাচকতার মধ্যেও ইতিবাচক কণ্ঠ থাকা জরুরি।

জীবনের মোড় ঘোরানো গল্প

ছয় ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয় সন্তান নাদিয়া বড় হয়েছেন এমন এক পরিবেশে, যেখানে আগের প্রজন্মের নারীরা গৃহিণী ছিলেন। তিনি লক্ষ্য করেছেন, জীবন নিয়ে তারা খুব সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাই তিনি চেয়েছিলেন ভিন্ন কিছু করতে।
তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে সমাজকর্মী হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পরিবার তাকে সেই সুযোগ দেয়নি। পরে বিয়ে তার জন্য নতুন পথ তৈরি করে দেয় এবং সেখানেও তিনি নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিয়েছেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি পড়াশোনা করেন এবং পরিবারের প্রথম নারী হিসেবে ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তার স্বামী তাকে ‘বেক অফ’ অনুষ্ঠানে আবেদন করতে উৎসাহ দেন, যা তার জীবন বদলে দেয়।

কঠিন অভিজ্ঞতা ও নীরবতার সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন
নাদিয়া বরাবরই বর্ণবাদ, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছেন। তার আত্মজীবনীতে শৈশবে যৌন নির্যাতনের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
তিনি জানান, পরিবার কখনোই এ বিষয়ে কথা বলেনি—কারণ তাদের সংস্কৃতিতে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয় না। তার মতে, এই নীরবতা লজ্জা, পারিবারিক সম্মান এবং ‘নাম রক্ষা’ করার সংস্কৃতি থেকেই এসেছে। তিনি মনে করেন, সমাজ ও পরিবারে অনেক সময় পুরুষদের বেশি সুরক্ষা দেওয়া হয়, ফলে অনেক সত্য চাপা পড়ে যায়।

সন্তানদের জন্য উদাহরণ হতে চান নাদিয়া

৪১ বছর বয়সী নাদিয়ার তিন সন্তান। তিনি বলেন, ‘সন্তানদের সামনে সব সময় উদাহরণ তৈরি করতে চান। তাই নিজের জীবনে পরিবর্তন এনেছেন এবং সাহস করে সত্য কথা বলছেন।
নাদিয়ার ভাষায়, সন্তানদের দেখা দরকার যে সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।’ তিনি আরও বলেন, গত বছর তিনি শিখেছেন—নিজের সত্যটা বলা সব সময় গুরুত্বপূর্ণ।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

নাদিয়া এখনও নিশ্চিত নন, ভবিষ্যতে তার ক্যারিয়ার কোন পথে যাবে। তিনি কিছুদিন প্রাইমারি স্কুলে টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করেছিলেন, তবে স্বাস্থ্যগত কারণে তা চালিয়ে যেতে পারেননি। ভবিষ্যতে পড়াশোনার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর কথাও ভাবছেন।
তিনি আরও টিভি শো করতে চান, তবে এবার এমনভাবে—যেখানে খাবারই হবে মূল কেন্দ্র। তার মতে, আগে অনেক কাজেই খাবারের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো সেট, সাজসজ্জা বা লুকের মতো বাহ্যিক বিষয়ের ওপর। এমনকি অনেক সময় তিনি রেসিপির সঙ্গে পুরোপুরি যুক্ত থাকতে পারতেন না।
এখন তিনি চান এমন একটি জায়গা তৈরি করতে, যেখানে তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন এবং নিজের শর্তে কাজ করতে পারবেন। পাশাপাশি শিশুদের জন্য আরও বই লেখার আগ্রহও রয়েছে তার।
নাদিয়ার কথায়, ‘আমি এমন একটা জায়গা তৈরি করতে চাই, যেখানে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করব। থাকব নিজের শর্তে, নিজের মতো করে।’