বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬
বিশ্লেষণ

নীরব বৈষম্যের গভীর ক্ষত— নারীর মস্তিষ্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব

_118780580_melissagenderfamilygettyjavier.jpg

দৈনন্দিন জীবনে ছড়িয়ে থাকা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য অনেক সময় চোখ এড়িয়ে যায়, যেন এগুলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এই ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নেওয়া আচরণই নারীর মানসিক ও স্নায়বিক স্বাস্থ্যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।

ব্রিটিশ গণমাধ্যমের এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, অবাঞ্ছিত যৌন মনোযোগ বা সূক্ষ্ম যৌনতাবাদ সবসময় তাৎক্ষণিক হুমকি হিসেবে ধরা পড়ে না। ফলে অনেকেই তা উপেক্ষা করেন। কিন্তু গবেষণা বলছে, এসব অভিজ্ঞতা শরীর ও মনে ধীরে ধীরে জমে থেকে গভীর প্রভাব ফেলে।

গত শতাব্দীতে নারী অধিকার আন্দোলনের ফলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে—অনেক দেশে সমান বেতন আইনি বাধ্যবাধকতা, লিঙ্গবৈষম্য অবৈধ, এবং রাজনীতিতেও নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। তবুও বৈশ্বিক বাস্তবতা আশাব্যঞ্জক নয়। অনেক জায়গায় লিঙ্গসমতা স্থবির, কোথাও আবার পিছিয়ে পড়ছে। নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতাও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

বিশ্বব্যাপী পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে একজন জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হন। এর পাশাপাশি রয়েছে সূক্ষ্ম যৌনতাবাদ—যেখানে নারীদের ‘সংবেদনশীল’ বা ‘স্নেহময়ী’ হিসেবে দেখিয়ে, পুরুষদের তুলনায় তাদের কম সক্ষম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এসব ধারণা আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক মনে হলেও, এগুলো নারীর ক্ষমতায়নকে বাধাগ্রস্ত করে এবং সামাজিকভাবে তাদের অধীনস্থ অবস্থানকে আরও দৃঢ় করে।

একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় ২৯টি দেশের ৭,৮০০-র বেশি মস্তিষ্কের স্ক্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, লিঙ্গ বৈষম্য নারীর মস্তিষ্কের গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে। যেসব দেশে লিঙ্গ বৈষম্য বেশি, সেসব দেশের নারীদের মস্তিষ্কের কিছু অংশে কর্টিকাল পুরুত্ব তুলনামূলকভাবে কম—যা মানসিক নিয়ন্ত্রণ, চাপ মোকাবিলা এবং বিষণ্নতার মতো সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি বৈষম্য ও চাপ মস্তিষ্কে ‘দাগ’ ফেলে যেতে পারে। মস্তিষ্কের অভিযোজন ক্ষমতা বা প্লাস্টিসিটির কারণে আমাদের অভিজ্ঞতা সরাসরি মস্তিষ্কের গঠনে প্রভাব ফেলে। ফলে বারবার অবমূল্যায়নের অভিজ্ঞতা মানসিক সুস্থতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

অন্য গবেষণাতেও একই ধরনের ফল পাওয়া গেছে। যুক্তরাজ্যে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, যারা লিঙ্গবৈষম্যের শিকার হন, চার বছর পর তাদের মানসিক স্বাস্থ্য আরও খারাপ হয়ে যায়। প্রায় তিন হাজার নারীর ওপর চালানো ওই গবেষণায় প্রতি পাঁচজনের একজন বৈষম্যের অভিজ্ঞতার কথা জানান। এসব অভিজ্ঞতার মধ্যে রয়েছে জনসমক্ষে অনিরাপত্তা বোধ, অপমান এবং শারীরিক আক্রমণ।

গবেষকদের মতে, এ ধরনের পুনরাবৃত্ত চাপ শরীরে জৈবিক পরিবর্তন ঘটায়, যা পরে মানসিক অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ায়। ফলে লিঙ্গবৈষম্য কেবল সামাজিক সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবেও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বৈষম্য কমাতে পারলে নারীর মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের উন্নতি সম্ভব। তাই লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করা শুধু ন্যায্যতার প্রশ্ন নয়—এটি সুস্থ সমাজ গঠনের অপরিহার্য শর্ত।

ক্ষতদীর্ঘস্থায়ীনারীবৈষম্যমস্তিষ্ক