ঈদযাত্রায় আনন্দ ছাপিয়ে মৃত্যুর মিছিল, ১৫ দিনে প্রাণ গেল ৩৯৪ জনের

ঈদের আনন্দ মানেই ঘরমুখো মানুষের ঢল, প্রিয়জনের সঙ্গে মিলনের উচ্ছ্বাস। কিন্তু সেই আনন্দের পথই যেন বারবার পরিণত হচ্ছে শোকের সড়কে। এবারের ঈদযাত্রাতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথ মিলিয়ে প্রাণ গেছে ৩৯৪ জনের—যা এক গভীর উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরেছে।
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য প্রকাশ করে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে তাদের সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেল এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান বলছে, ৩৭৭টি দুর্ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটেছে সড়কপথে। ৩৪৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩৫১ জন, আহত হয়েছেন ১ হাজার ৪৬ জন। অর্থাৎ, মোট মৃত্যুর সিংহভাগই সড়ক দুর্ঘটনায়।
রেলপথেও চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়। ২৩টি দুর্ঘটনায় ৩৫ জন নিহত এবং ২২৩ জন আহত হয়েছেন। নৌপথে ৮টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৮ জনের, আহত হয়েছেন ১৯ জন, আর এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৩ জন।
সব মিলিয়ে, ঈদযাত্রার সময়কাল—১৪ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ—দেশের পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতা যেন আবারও নগ্নভাবে সামনে এসেছে।
গত বছরের তুলনায় এবারের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরে ৩১৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ৩২২ জন। সেই তুলনায় এবার দুর্ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ, আর প্রাণহানি বেড়েছে ৮ শতাংশের বেশি। আহতের সংখ্যা বেড়েছে ২১ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়—প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি অপূরণীয় ক্ষতি।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবারের ঈদেও দুর্ঘটনার তালিকায় শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল। ১২৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৫ জন নিহত হয়েছেন। যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৩৬ শতাংশ। এছাড়াও দুর্ঘটনার শিকার মোট যানবাহনের ২৭ দশমিক ১৬ শতাংশ মোটরসাইকেল, ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান, ১৬ দশমিক ২২ শতাংশ বাস, ১৫ দশমিক ২৮ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা, ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ প্রাইভেটকার-মাইক্রোবাস, ৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ নছিমন-করিমন এবং ৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা এসব দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুতগতির প্রবণতা, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহারে অনীহা এবং ট্রাফিক আইন অমান্যের কারণে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী দুর্ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরেন—
- পরিবহন খাতে দুর্বল তদারকি
- ভাড়া নৈরাজ্য
- বাস মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রভাব
- সড়ক ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের অভাব
তিনি অভিযোগ করেন, ঈদ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বৈঠকগুলোতে যাত্রীদের প্রতিনিধিত্বকারী কোনো নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ না থাকায় বাস্তব সমস্যাগুলো উপেক্ষিত থেকে যায়।
সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা বোঝাতে আরেকটি তথ্যই যথেষ্ট—শুধু আহত হয়ে জাতীয় অর্থোপেডিক (পঙ্গু) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ১৭৮ জন। এটি প্রমাণ করে, দৃশ্যমান পরিসংখ্যানের বাইরেও দুর্ঘটনার প্রকৃত প্রভাব আরও গভীর।
প্রতিবেদনে একটি চমকপ্রদ তুলনাও তুলে ধরা হয়। চলমান ইরান-ইসরায়েল সংঘাত-এ সাম্প্রতিক হতাহতের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, একই সময়ে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি।
এই তুলনা কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং একটি কঠিন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি—আমাদের সড়কগুলো কতটা অনিরাপদ।
সংবাদ সম্মেলনে দুর্ঘটনা কমাতে ১৩ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- কঠোর ট্রাফিক আইন প্রয়োগ
- চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থার উন্নয়ন
- ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন নিয়ন্ত্রণ
- সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন
- যাত্রীসচেতনতা বৃদ্ধি
ঈদযাত্রা যেন আর শোকযাত্রায় পরিণত না হয়—এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়। চালক, যাত্রী, পথচারী—সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
কারণ, একটি দুর্ঘটনা শুধু একটি প্রাণই কেড়ে নেয় না, ভেঙে দেয় একটি পরিবার, থামিয়ে দেয় একটি জীবনের গল্প।



