বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
বিবিধ

খাদ্যসহায়তা কমছে, শঙ্কায় রোহিঙ্গা জীবন

খাদ্যসহায়তা কমছে, শঙ্কায় রোহিঙ্গা জীবন

কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ আশ্রয়শিবিরে বসবাসরত ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গার জীবনে নতুন করে অনিশ্চয়তা নেমে এসেছে। আগামী ১ এপ্রিল থেকে মাসিক খাদ্যসহায়তার কাঠামো বদলে যাচ্ছে। আগে যেখানে প্রত্যেকে ১২ ডলার করে পেত, এখন পরিবারভেদে ৭, ১০ ও ১২ ডলারে ভাগ করে দেওয়া হবে সহায়তা। আন্তর্জাতিক তহবিল সংকটের কারণ দেখিয়ে নেওয়া এই সিদ্ধান্তে শিবিরজুড়ে তৈরি হয়েছে অস্বস্তি, ক্ষোভ আর অজানা ভবিষ্যতের ভয়।

ত্রিপলের ছোট্ট ঘর, সংকীর্ণ গলি আর অনিশ্চয়তায় ভরা জীবন—এই বাস্তবতার মধ্যেই টিকে আছেন হাজারো পরিবার। টেকনাফের জাদিমুরা শিবিরে স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান নিয়ে আট বছর ধরে বসবাস করছেন ছৈয়দ করিম। একসময় প্রতিদিন ২০০-৩০০ টাকা আয় করতেন বাইরে গিয়ে শ্রমের কাজ করে। কিন্তু এখন কড়াকড়ির বেড়াজালে সেই পথও বন্ধ। সাত সদস্যের সংসার চালাতে মাসে যে সামান্য সহায়তা পান, তা দিয়েই কোনোমতে দিন কাটে। নতুন সিদ্ধান্তে সেই সহায়তা কমে গেলে কীভাবে বাঁচবেন—তা ভেবে পাচ্ছেন না তিনি।

জাদিমুরা শিবিরে প্রায় ৩৭ হাজার মানুষের বাস। তাদের অধিকাংশই ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে এসেছে সহিংসতার মুখে। বছরের পর বছর কেটে গেলেও প্রত্যাবাসনের কোনো অগ্রগতি নেই। একই চিত্র পাশের লেদা শিবিরেও। চায়ের দোকান, হাট কিংবা খোলা আড্ডায় এখন একটাই আলোচনা—কমে যাওয়া সহায়তায় কীভাবে চলবে সংসার।

রোহিঙ্গা নেতারা বলছেন, বর্তমান ১২ ডলার দিয়েই একটি পরিবারের মাস চলে না, অনেক সময় অর্ধেক মাসেই খাবার ফুরিয়ে যায়। সেখানে সহায়তা কমানো হলে অপুষ্টি, খাদ্যসংকট ও নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বাড়বে। বিশেষ করে শিশুদের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই বহু শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে, নতুন পরিস্থিতি তাদের জীবনকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।

বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে ২ লাখ ৪৫ হাজার পরিবারের ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালের পরের কয়েক মাসে এসেছে প্রায় আট লাখ। গত আট বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। উল্টো গত দেড় বছরে নতুন করে আরও দেড় লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে ঢুকেছে। ফলে চাপ বেড়েছে সীমিত সম্পদের ওপর।

আরআরআরসি কার্যালয় ও শিবির সূত্রে জানা গেছে, ১ এপ্রিল থেকে পরিবারগুলোকে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে খাদ্যসহায়তা দেওয়া হবে। যেসব পরিবারে আয় করার মতো সদস্য রয়েছেন এবং নির্ভরশীল কম, তাদের ‘এ’ ক্যাটাগরিতে রেখে সাত ডলার দেওয়া হবে। এমন পরিবারের সংখ্যা প্রায় ১৭ শতাংশ।

নারী, শিশু ও নির্ভরশীল সদস্য বেশি—এমন পরিবারকে ‘সি’ ক্যাটাগরিতে রেখে ১২ ডলার দেওয়া হবে, যা প্রায় ৩৩ শতাংশ। অন্যদিকে মাঝামাঝি অবস্থার ৫০ শতাংশ পরিবার ‘বি’ ক্যাটাগরিতে পড়ে, তারা পাবে ১০ ডলার করে।

বাস্তবতা বলছে, এই পরিবর্তন শিবিরজীবনকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। খাদ্যের প্লেটে ভাত কমলে শুধু পেটই খালি থাকে না—খালি হয়ে যায় ভবিষ্যতের স্বপ্নও। আর সেই স্বপ্ন নিয়েই দিন গুনছে কক্সবাজারের শিবিরে থাকা লক্ষ লক্ষ মানুষ।

Advertisements