বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬
নারী

সহিংসতা থেকে উদ্ধারের পরও অনিশ্চিত জীবন

New_Project_-_2025-10-02T223113.501

বাংলাদেশের নারীরা আজ শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, নেতৃত্ব—প্রায় সব জায়গাতেই নারীর অগ্রগতি দৃশ্যমান। কিন্তু এই অগ্রগতির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক কঠিন বাস্তবতা। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা এখনো থামেনি, বরং নানা রূপে অব্যাহত রয়েছে। উদ্ধার অভিযান, আইন, সচেতনতা—সবই আছে; তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, কেন এই সংকট কাটছে না?

ধরা যাক, রাজশাহীর এক কলেজ ছাত্রীর কথা। অনলাইনে পরিচয়ের সূত্র ধরে সে এক প্রতারণার ফাঁদে পড়ে। পরে ব্ল্যাকমেইল ও নির্যাতনের শিকার হয়। সাহস করে পরিবারকে জানালে পুলিশি সহায়তায় অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়। চারপাশে স্বস্তি—’ন্যায়বিচার শুরু হয়েছে।’ কিন্তু মেয়েটির জন্য তখনও লড়াই শেষ হয়নি। সামাজিক চাপ, মানসিক ট্রমা, আর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া তাকে নতুন এক অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়।

প্রায়ই একটি প্রশ্ন ওঠে, নারীর প্রতি সহিংসতা কি সত্যিই বেড়েছে, নাকি এখন শুধু অভিযোগ বেশি হচ্ছে?

এর নির্দিষ্ট উত্তর দেওয়া কঠিন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট সহিংসতা থামেনি। বরং সমাজে সচেতনতা কিছুটা বাড়লেও মানুষ আগের তুলনায় বেশি সামনে আসায় ঘটনাগুলো এখন বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে।তবুও বাস্তবতার এই যে, অনেক ঘটনাই এখনও প্রকাশ পায় না। লোকলজ্জা, সামাজিক চাপ এবং ভবিষ্যতের ভয়—এসব কারণে অসংখ্য পরিবার নীরব থেকে যায়।

উদ্ধার মানেই সমাধান নয়। উদ্ধার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, কিন্তু সেটিই চূড়ান্ত সমাধান নয়। বরং এখান থেকেই শুরু হয় আরেকটি কঠিন পথচলা। উদ্ধারের পর একজন নারীর প্রয়োজন—চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, আইনি সুরক্ষা, নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু বাস্তবে এই সেবাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। অনেক ক্ষেত্রে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত মানবিক নয়, আবার আইনি সহায়তা পেতে সময় লাগে। ফলে ভুক্তভোগী নিজেকে অসহায় মনে করেন।

সহিংসতা বন্ধ না হওয়ার অন্যতম বড় কারণ হলো বিচারহীনতা। গবেষণায় দেখা গেছে, ধর্ষণের ঘটনায় সাজা পাওয়ার হার খুবই কম। আগে যেখানে ২-৩ শতাংশ ছিল, এখন তা আরও কমেছে।ফলে অপরাধী অনেক সময় ধরে নেয়—’শেষ পর্যন্ত কিছুই হবে না।’ এই মানসিকতা সহিংসতাকে আরও উৎসাহিত করে।


আবার, একজন নির্যাতিত নারীর সবচেয়ে বড় আশ্রয় হওয়ার কথা পরিবার হলেও অনেক ক্ষেত্রে পরিবারই হয়ে ওঠে চাপের উৎস।সমাজে এখনও এমন ধারণা আছে যে, নির্যাতনের শিকার হওয়া মানেই ‘সম্মানহানি’। ফলে অনেক নারী দ্বিগুণ আঘাত পান। একবার অপরাধীর কাছ থেকে, আরেকবার সমাজ বা তার পরিবারের কাছ থেকে।

নারীর প্রতি সহিংসতার একটি বড় কিন্তু অনেকটা উপেক্ষিত রূপ হলো বাল্যবিয়ে। এটি কেবল একটি সামাজিক প্রথা নয়, বরং একটি কাঠামোগত সহিংসতা।যদিও বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়েছে, বাস্তবে সেগুলোর কার্যকারিতা সীমিত। ফলে আইন থাকা সত্ত্বেও এই সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না।

যে কোন ধরনের সহিংসতা থেকে উদ্ধারের পর যদি একজন নারী অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে না পারেন, তাহলে তার জন্য নতুন জীবন শুরু করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ধরা যাক, পতিতাপল্লী থেকে একজন নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে কিছুদিন থাকলেন। পরে যদি তার কোনো কাজ বা আয়ের ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে তিনি আবার অনিরাপদ পরিবেশে ফিরে যেতে বাধ্য হতে পারেন। এভাবে সহিংসতার যে চক্র, তা চলতেই থাকে। সমন্বিত ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি

ব্যতীত এই সমস্যার সমাধান বিচ্ছিন্নভাবে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন—

১.উদ্ধার-পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ সাপোর্ট সিস্টেম যেখানে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা ও পুনর্বাসন সবকিছু একসঙ্গে সংযুক্ত থাকবে।

২.শেল্টার হোমগুলোকে বাসযোগ্য, উন্মুক্ত ও সহায়ক পরিবেশে রূপান্তর করতে হবে।

৩.বিচার প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও কার্যকর করতে হবে।

৪.বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে স্থানীয় কমিটিগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

৫.দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে।

৬. সবশেষে,সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নারীকে পূর্ণ মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখা এবং ভুক্তভোগীকে দোষারোপের সংস্কৃতি ভাঙা।

সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াই শুধু অপরাধ দমন নয়; এটি একটি সামাজিক রূপান্তরের প্রক্রিয়া। উদ্ধার, আইন, বিচার—সবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এগুলো তখনই কার্যকর হবে, যখন সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে এবং রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পূর্ণভাবে পালন করবে।

যেদিন একজন নারী নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরও ভেঙে না পড়ে, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের সহায়তায় নতুন জীবন শুরু করতে পারবেন, সেদিনই এই লড়াই সত্যিকার অর্থে সফল হবে।

অনিশ্চিতনারীসহিংসতা