বাংলাদেশের নারী ও জীবনধারার ম্যাগাজিনবুধবার, ১৩ মে, ২০২৬
বিনোদন

আর্কাইভে বন্দী এক যুদ্ধগাথা: কেন মুক্তি পাচ্ছে না ‘অপারেশন জ্যাকপট’?

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এমন কিছু অধ্যায় আছে, যেগুলো কেবল সামরিক সাফল্য নয়—একটি জাতির আত্মবিশ্বাস, সাহস আর প্রতিরোধের প্রতীক। অপারেশন জ্য...

১৯৭১ সালের ৫ আগস্ট মধ্যরাতের পর পরিচালিত অপারেশন জ্যাকপটে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এমন কিছু অধ্যায় আছে, যেগুলো কেবল সামরিক সাফল্য নয়—একটি জাতির আত্মবিশ্বাস, সাহস আর প্রতিরোধের প্রতীক। অপারেশন জ্যাকপট তেমনই এক অধ্যায়। ১৯৭১ সালের আগস্টে পরিচালিত এই দুঃসাহসিক নৌ কমান্ডো অভিযান পাকিস্তানি বাহিনীর ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। সেই ইতিহাসকে বড় পর্দায় তুলে ধরার উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছিল একই নামের একটি চলচ্চিত্র।

কিন্তু নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও প্রায় দুই বছর ধরে চলচ্চিত্রটি বন্দী হয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়–এর আর্কাইভে। মুক্তির অনিশ্চয়তা ঘিরে তৈরি হয়েছে প্রশ্ন, বিতর্ক এবং হতাশা।

মুক্তিযুদ্ধের সময় অপারেশন জ্যাকপট সারা বিশ্বে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। শত্রুপক্ষ পাকিস্তানের মনোবলে আঘাত করেছিল অপারেশন জ্যাকপট। ১৯৭১ সালের ১৬ আগস্ট প্রথম প্রহরে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, মোংলা সমুদ্রবন্দর, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরে একযোগে অভিযান চালান নৌ কমান্ডোরা। এ অভিযানে পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অস্ত্র, খাদ্য ও তেলবাহী ২৬টি জাহাজে মাইন স্থাপন করে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।

এই গেরিলা অভিযানে অংশগ্রহণকারী অসমসাহসী কোনো মুক্তিযোদ্ধা শত্রুপক্ষের হাতে ধরা পড়েননি। তাই যুদ্ধ চলাকালে বাঙালির শৌর্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিল অপারেশন জ্যাকপট।

বড় বাজেট, বড় প্রত্যাশা
অপারেশন জ্যাকপটের বীরত্বগাথা চলচ্চিত্রে তুলে ধরতে অপারেশন জ্যাকপট নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ প্রথমে নেওয়া হয়েছিল ২০১৭ সালে। তখন নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে ৩০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়, নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয় নির্মাতা গিয়াসউদ্দিন সেলিমকে। তবে সেই প্রকল্পও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

পরে ২০২২ সালে নতুনভাবে উদ্যোগ নেয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তখনকার পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান নিজ ক্ষমতাবলে ২৩ কোটি টাকার এই প্রকল্পের অনুমোদন দেন।

চলচ্চিত্রটি পরিচালনার দায়িত্ব পান দেলোয়ার জাহান ঝন্টু ও কলকাতার রাজীব কুমার। প্রযোজনা করে কিবরিয়া ফিল্মস। এতে অভিনয় করেছেন ইলিয়াস কাঞ্চন, অমিত হাসান, অনন্ত জলিল, রোশান, নিরব, মিশা সওদাগরসহ জনপ্রিয় অনেক তারকা।

সব মিলিয়ে এটি ছিল দেশের ইতিহাসভিত্তিক বড় পরিসরের একটি সিনেমা—যার প্রতি প্রত্যাশাও ছিল আকাশছোঁয়া।

এই সিনেমায় দর্শকের কাছে পরিচিত, এমন শতাধিক অভিনেতা-অভিনেত্রী কাজ করেছেন। মুখ্য চরিত্রগুলোর মধ্যে আছেন—ইলিয়াস কাঞ্চন, অমিত হাসান, অনন্ত জলিল, রোশান, ইমন, নিরব, শিপন মিত্র, সাঞ্জু জন, জয় চৌধুরী ও আমান রেজা। এ ছাড়া আছেন মিশা সওদাগর, আহমেদ শরীফ, ডন, ড্যানি সিডাকসহ আরও অনেকে।

সিনেমাটি এখনো মুক্তি না পেলেও নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কিবরিয়া ফিল্মসকে পুরো অর্থ ২১ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

ইতিহাস বনাম উপস্থাপন—বিতর্কের শুরু এখানেই
চলচ্চিত্রটি ২০২৪ সালের জুনে মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার পর শুরু হয় মূল জটিলতা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সামনে ছবিটি প্রদর্শনের পরই উঠে আসে একাধিক প্রশ্ন।

অভিযোগ ছিল—

  • ১৯৭১ সালের অভিযানের প্রকৃত চিত্র যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি
  • কিছু ক্ষেত্রে ইতিহাসের সঙ্গে অসামঞ্জস্য রয়েছে
  • চিত্রনাট্যে দুর্বলতা ও নাটকীয় অতিরঞ্জন আছে

মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় এসব বিষয় গুরুত্ব পায়। এমনকি একাধিক বৈঠকের পরও এই আপত্তি দূর করা সম্ভব হয়নি। ফলে ছবিটির মুক্তি স্থগিত রাখা হয়।

দুই সরকার, একই সিদ্ধান্ত
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেমন ছবিটি নিয়ে সংশোধনের কথা বলা হয়েছিল, তেমনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও একই ধরনের পর্যবেক্ষণ আসে।

মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, বিষয়টি ‘স্পর্শকাতর’ হওয়ায় কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি কর্তৃপক্ষ। ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ উঠতে পারে—এই আশঙ্কায় ছবিটি জনসমক্ষে আনা হয়নি।

বর্তমানে নতুন সরকারের উচ্চপর্যায়ে বিষয়টি উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে তবেই মুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

এখন প্রশ্ন একটি জাতির বীরত্বগাথা কি পর্দায় উঠে আসবে, নাকি নথির স্তূপেই হারিয়ে যাবে?

মুক্তিযুদ্ধযুদ্ধগাথাসিনেমা