বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ২০ মে, ২০২৬
জীবনযাপন

বজ্রপাতের আঘাতে মানুষের শরীরে যেসব ক্ষতি হয়

বজ্রপাতের আঘাতে মানুষের শরীরে যেসব ক্ষতি হয়

বজ্রপাত একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও এর ভয়াবহতা মোটেও সাধারণ নয়। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হন, যার একটি বড় অংশ প্রাণ হারান। ধারণা করা হয়, প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার মানুষ বজ্রপাতে আক্রান্ত হন এবং তাদের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশের মৃত্যু ঘটে। তবে যারা বেঁচে যান, তাদের জীবন আর আগের মতো স্বাভাবিক থাকে না। বজ্রপাতের সময় মানুষের শরীরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয় বিপুল ভোল্টের বিদ্যুৎ, যা রেখে যায় দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি।

যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনার বাসিন্দা গ্যারি রেনল্ডস পেশায় একজন কাঠমিস্ত্রি। অবিশ্বাস্য হলেও তিনি চারবার বজ্রপাতের শিকার হয়েছেন। প্রথমবার ২০০৭ সালে নিজের গ্যারেজে ফ্রিজ থেকে পানীয় নিতে গিয়ে তিনি এই দুর্ঘটনার মুখোমুখি হন। সেই অভিজ্ঞতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, তিনি দীর্ঘদিন তীব্র যন্ত্রণায় ভুগেছেন এবং মাসের পর মাস স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেননি। শুধু শারীরিক কষ্টই নয়, এই ঘটনা তার মানসিক অবস্থাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তার ভাষায়, বাইরে থেকে একজন মানুষকে আগের মতোই মনে হলেও ভেতরে সে পুরোপুরি বদলে যেতে পারে।

বজ্রপাতের প্রভাব ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে। কেউ তীব্র ব্যথা অনুভব করেন, আবার কেউ শরীরের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহের মুহূর্তটি টেরই পান না। ম্যাট নামে একজন ভুক্তভোগী জানান, বজ্রপাতের ফলে তার স্নায়ুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন তিনি শরীরে ব্যথা বা তাপমাত্রার পরিবর্তন অনুভব করতে পারেন না। দীর্ঘদিন তিনি নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে ফ্যারাডে খাঁচার মতো বিদ্যুৎ নিরোধক পরিবেশে ঘুমাতেন। এমনকি মানসিক অস্থিরতা কমাতে অদ্ভুত কিছু অভ্যাসও তার মধ্যে গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে ক্যারোলিন নামে এক নারী জানান, বজ্রপাতের পর তার শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতায় পরিবর্তন এসেছে—তিনি আর ঘামতে পারেন না এবং তার স্মৃতিশক্তিও অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। দৈনন্দিন কাজ মনে রাখতে তাকে লিখে রাখতে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৬ সাল থেকে বজ্রপাতে অন্তত ৪৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষ করে ফ্লোরিডার মতো অঞ্চলে আর্দ্রতা ও আবহাওয়াগত কারণে বজ্রপাতের ঘটনা বেশি ঘটে। বজ্রপাতে বেঁচে যাওয়া মানুষদের সহায়তার জন্য ‘লাইটেনিং স্ট্রাইক অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল শক সারভাইভারস ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন স্টিভ মার্শবার্ন সিনিয়র, যিনি নিজেও তরুণ বয়সে বজ্রপাতের শিকার হয়েছিলেন। তার মতে, এই অভিজ্ঞতা এতটাই জটিল যে অনেক সময় তা অন্যদের বোঝানো কঠিন হয়ে পড়ে, এমনকি চিকিৎসক বা কাছের মানুষও পুরোটা উপলব্ধি করতে পারেন না।

গ্যারি রেনল্ডসের মতো অনেকেই মনে করেন, বজ্রপাত যেন তাদের বারবার তাড়া করে। তবুও তারা জীবনযুদ্ধে হার মানেননি। তাদের অভিজ্ঞতা শুধু অলৌকিক বেঁচে থাকার গল্প নয়, বরং একটি কঠিন সত্যের প্রতিচ্ছবি—প্রকৃতির শক্তির সামনে মানুষ কতটা অসহায়। তাই এই ঝুঁকি থেকে বাঁচতে সচেতনতা এবং সতর্কতাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা।

বজ্রপাত