বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬
নারী

সিডরের ধ্বংসস্তূপ থেকে স্বাবলম্বিতার পথে: রুনা রানীর অনন্য ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

untitled-11-1773537937

২০০৭ সালে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সেই ভয়াল রাতে উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটের বাসিন্দা রুনা রানী বিশ্বাসের জীবনে নেমে আসে চরম দুর্যোগ। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ শুধু তাঁর বসতভিটাই কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছিল স্বাভাবিক জীবনের শেষ আশ্রয়টুকুও।

শারীরিক প্রতিবন্ধী স্বামী এবং চারটি ছোট সন্তানকে নিয়ে রুনা পড়েন অসহায় পরিস্থিতিতে। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে তিনি আশ্রয় নেন বাবার বাড়িতে। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রাম।

সংসারের দায় কাঁধে নিয়ে রুনা অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ শুরু করেন। অপ্রতুল আয়, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং সন্তানদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় কেটেছে তাঁর বহু নির্ঘুম রাত। তিনি স্মরণ করেন, সেই সময়কার আয় দিয়ে সংসার চালানো ছিল প্রায় অসম্ভব।

দীর্ঘদিনের এই সংগ্রামের মধ্যে ২০২৪ সালের মার্চে আসে পরিবর্তনের সূচনা। রুনা জানতে পারেন ‘স্বপ্ন’ প্রকল্পের কথা, যা বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার বিভাগ, সুইডেন সরকার, ম্যারিকো বাংলাদেশ এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির সহায়তায় পরিচালিত। প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল সুবিধাবঞ্চিত ও নারীপ্রধান পরিবারগুলোকে স্বাবলম্বী করে তোলা।

এই প্রকল্প রুনার জীবনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। কর্মসংস্থানের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে সঞ্চয়, জলবায়ু সচেতনতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা অর্জন করেন।

প্রকল্প থেকে পাওয়া আয় ও নিজের সঞ্চয় মিলিয়ে মাত্র ৫,২০০ টাকা পুঁজি নিয়ে স্থানীয় বাজারে সবজির ব্যবসা শুরু করেন রুনা। ধীরে ধীরে তাঁর ব্যবসা প্রসারিত হয়। লাভের টাকা দিয়ে তিনি ছাগল ক্রয় করেন, যা পরে সংখ্যায় বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি দুই বিঘা জমি লিজ নিয়ে মাছ ও ধানের সমন্বিত চাষ শুরু করেন, যা থেকে বছরে উল্লেখযোগ্য আয় আসে। সঞ্চয়ের মাধ্যমে একটি গাভিও কিনতে সক্ষম হন তিনি।

বর্তমানে রুনার দৈনিক আয় গড়ে প্রায় ৪০০ টাকা, যা মাস শেষে প্রায় ১৪ হাজার টাকায় দাঁড়ায়। এখন আর তাঁকে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে হয় না। তাঁর চার সন্তানই নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে এবং পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছে।

রুনা বলেন, “নিজের আয়ে সংসার চালাতে পারছি—এটাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন। এখন আমি ভালো আছি।”

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের মুখে উপকূলীয় নারীরা প্রতিনিয়ত নানা সংকটে পড়ছেন। এই প্রেক্ষাপটে রুনার সাফল্যের গল্প কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং নারী ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার একটি শক্তিশালী উদাহরণ।

‘স্বপ্ন’ প্রকল্পের মতো উদ্যোগ নারীদের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সঞ্চয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে সমাজে ন্যায়বিচার ও সমতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

দুর্যোগ ও দারিদ্র্যের কঠিন বাস্তবতা পেরিয়ে রুনা রানীর এই ঘুরে দাঁড়ানো প্রমাণ করে—সুযোগ পেলে নারীরা শুধু নিজেদের ভাগ্যই বদলাতে পারেন না, বরং একটি টেকসই ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ গড়তেও সক্ষম।

২০০৭রুনা রানীসিডরস্বাবলম্বি