বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬
বিবিধ

জ্বালানি সংকটের কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পণ্য সরবরাহ

জ্বালানি সংকটের কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পণ্য সরবরাহ

জ্বালানি সংকটের প্রভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি জীবনরক্ষাকারী ওষুধের স্বাভাবিক সরবরাহেও সমস্যা তৈরি হতে শুরু করেছে। বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করতে পারছে না। কারণ, পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল না থাকায় তাদের সব পরিবহন যানবাহন রাস্তায় নামানো সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে শিল্পকারখানার উৎপাদনেও।

এই পরিস্থিতি সামাল দিতে গত দুই দিনে বিভিন্ন পণ্যভিত্তিক ব্যবসায়ী সংগঠন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। তবে সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল না পাওয়ায় পণ্য সরবরাহ প্রায় ১০ শতাংশ কমে গেছে। এমনকি নদীপথে আসা অপরিশোধিত লবণ কারখানায় আনার জন্য ভাড়ার ট্রাকও পাওয়া যাচ্ছে না।

বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতির কারণে উৎপাদন থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন—সব পর্যায়েই সমস্যা তৈরি হচ্ছে। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বাজারে পণ্যসংকট আরও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে তেল ও গ্যাস উৎপাদন এবং সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় বাংলাদেশেও মানুষ পেট্রলপাম্পে ভিড় করছেন এবং দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি সংগ্রহ করছেন। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) গত রোববার থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমিয়ে দেয়। এর আগে ৬ মার্চ থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল বিক্রির ওপর সীমা নির্ধারণ করা হয়।

নিত্যপণ্য সরবরাহে প্রভাব

দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠীগুলোর একটি প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পণ্য পরিবহনের জন্য প্রায় সাড়ে তিন হাজার ট্রাক রয়েছে। এসব ট্রাকের জ্বালানি সাধারণত ডিপো থেকেই সংগ্রহ করা হয়। তবে কয়েক দিন ধরে ডিপো থেকে পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় তাদের অনেক ট্রাকই চালু রাখা যাচ্ছে না। বর্তমানে প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ট্রাক অলস পড়ে আছে, যার ফলে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘ফিলিং স্টেশনগুলোতে সিরিয়াল দিয়ে তেল নিতে বলা হচ্ছে। কিন্তু লাইনে দাঁড়ালে আধা দিন চলে যায়। অনেক সময় আবার পাম্পে তেলই পাওয়া যায় না। এভাবে চলতে থাকলে পণ্য সরবরাহ বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।’

সয়াবিন তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স রোববার বাণিজ্যসচিবের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, জ্বালানি সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব পরিবহনের অর্ধেকের বেশি ব্যবহার করতে পারছে না। এমনকি ভাড়ার যানবাহনও পাওয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে। তাই দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।

এদিকে দেশের আরেক বড় শিল্পগোষ্ঠী এসিআইয়ের ভোগ্যপণ্য সরবরাহেও প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তাদের ট্রাকগুলো ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে যে পরিমাণ জ্বালানি পাচ্ছে, তা দিয়ে বাজারের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এসিআই কনজ্যুমার ব্র্যান্ডের প্রধান ব্যবসা কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, ‘নিজস্ব ট্রাকগুলো চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি না পাওয়ায় পণ্য সরবরাহ প্রায় ১০ শতাংশ কমে গেছে। নদীপথে আসা অপরিশোধিত লবণ কারখানায় আনার জন্যও ভাড়ার ট্রাক পাওয়া যাচ্ছে না।’

অন্যদিকে জ্বালানি সংকটের কারণে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা নিয়েও উদ্বিগ্ন ওষুধশিল্পের উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি গতকাল জ্বালানিমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়ে ফিলিং স্টেশনগুলোতে ওষুধ পরিবহনে ব্যবহৃত যানবাহনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি তেল সরবরাহের সীমা শিথিল করার অনুরোধ জানিয়েছে।

ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব মো. জাকির হোসেন বলেন, কারখানা থেকে কেন্দ্রীয় গুদাম এবং সেখান থেকে ডিপো ও খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে ওষুধ পৌঁছাতে পর্যাপ্ত জ্বালানি প্রয়োজন। বর্তমানে তেল পাওয়ার জন্য ট্রাকগুলোকে রাত থেকেই লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। তবু প্রয়োজনীয় পরিমাণ জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে ওষুধ সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।

শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত

রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন চালিয়ে যেতে ডিজেলচালিত জেনারেটর ও বয়লার ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বর্তমান সংকটে প্রয়োজনীয় ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে লোডশেডিংয়ের সময় অনেক কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রতিটি কারখানার জন্য অন্তত ৫০০ লিটার ডিজেল সরবরাহের ব্যবস্থা করতে ফিলিং স্টেশনগুলোকে নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবের কাছে চিঠি দিয়েছে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ।

বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ঈদের আগে সব কারখানায় উৎপাদন ও রপ্তানির চাপ বেশি থাকে। এখনই যদি জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

করণীয় কী

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বৈশ্বিক সংকটের কারণে বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব পড়া স্বাভাবিক। এই বাস্তবতায় পুরোপুরি স্বাভাবিক উৎপাদন চালানো কঠিন। তবে সরকার চাইলে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে খাদ্যপণ্য, ওষুধ এবং রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানাকে অগ্রাধিকার দিতে পারে।

জ্বালানিজ্বালানি সংকট