বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬
নারী

ঘরের আঙিনা থেকে পাঁচ একর জমি: নারী ক্ষমতায়নে দিক পাল কৃষানী সুলেখা

ঘরের আঙিনা থেকে পাঁচ একর জমি: নারী ক্ষমতায়নে দিক পাল কৃষানী সুলেখা

রাজশাহীর চার ঘাট উপজেলার প্রত্যন্ত এক গ্রাম ঝিকরা। সদ্য উচ্চ মাধ্যমিক পেরনো সুলেখা বিয়ের পর ঝিকরা গ্রামেই শুরু করেন তার নতুন জীবন। গ্রাম্য চিকিৎসক দরিদ্র বাবার বাড়িতে আট ভাই-বোনের সংসার, বিয়ের পরে স্বামীর স্পল্প আয় ও পারিবারিক আর্থিক সংকট তাকে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়করায়।
সেই সময়ের কথা স্মরণ করে সুলেখা বলেন, ‘বিয়ের সময় আমি পড়াশোনা করছিলাম। স্বামীর স্থায়ী আয় না থাকায় আমাদের পরিবারে আর্থিক অনিশ্চয়তা ছিল। স্বামীর বাড়ির লোকেরা আমাকে পরিবারের জন্য বোঝা মনে করত।’

পরিবারের লোকের কটু কথায় কষ্ট হলেও স্বপ্ন ছিল আরো পড়ালেখা করবেন। শত প্রতিক‚লতার মাঝেই পড়াশোনা চালিয়ে যান সুলেখা, এর পাশাপাশি বাড়ির পেছনের ছোট্ট এক টুকরো জমিতে চাষাবাদ শুরু করেন ভাগ্য পরিবর্তনের আশায়। কিন্তু অবস্থার কোন পরিবর্তন আসেনা। কৃষি সংক্রান্ত পর্যাপ্ত জ্ঞান, প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তার অভাব, পাশাপাশি নারী হিসেবে সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে, তার পথ চলা সহজ ছিলনা। তবুও হাল ছাড়েননি তিনি। সেদিনের সেই অসহায় সুলেখা আজ তার পাশের কয়েক গ্রামের শতনারী কৃষকের জন্য অনুপ্রেরণা।

এসএসসি’র ধাপ পেরিয়ে স্থানীয় এক এনজিওতে স্বল্প বেতনে চাকুরি নেন সুলেখা। স্বামী বেকার, তাই সংসারের সব ভার তার একার কাঁধে,পাশাপাশি চলছে পড়াশোনা। সুলেখা বলেন, ‘এরইমধ্যে আমি প্রথম মা হই, পুষ্টিকর খাবার তো দূরের কথা, তিন বেলা ভাতই জুটতো না। আমার বাচ্চাটা জন্মের পর পরই মারা যায়, এরপর শাশুরবাড়িতে টেকা কঠিন হয়ে পড়ে।’

এরপরও ঘুরে দাড়াঁন সুলেখা।চাকুরির টাকা একটু একটু জমিয়ে একটি গাভীগরু কিনেন, ও এক বিঘা জমি বন্ধক নিয়ে কৃষি কাজ শুরু করেন। ঘরের বউ সংসার সামলাবে, কেন মাঠে কৃষি কাজ করবে এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় প্রতিনিয়ত, কিন্তু থেমে যায়নি সুলেখা।

২০২৩ সালে কৃষকদের এক স্কুলের কথা শোনেন এলাকার কৃষকদের কাছে। স্কুলের নাম-‘ফার্মারস্কুল’। রাজশাহীর চারঘাট উপজেলায় সরদহ ইউনিয়ন তথা স্থানীয় সরকারের সহযোতিগায় সিনজেনটা বাংলাদেশ গড়ে তুলেছে দেশের প্রথম ‘ফার্মার স্কুল’ – একটি সমন্বিত শিক্ষা ও সচেতনতা কেন্দ্র, যা আধুনিক কৃষিজ্ঞান, দক্ষতা ও উদ্ভাবনী চর্চার মাধ্যমে কৃষকদের ক্ষমতায়নে কাজ করছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকদের বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে চাষাবাদ,সার ও কৃষি উপকরনের সঠিক ও নিরাপদ ব্যবহার,শস্যের জন্য পরিমিত পুষ্টির ব্যবস্থা করে উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষকদের জীবন মানের উন্নয়ন ঘটানো, আধুনিক চাষাবাদের মাধ্যমে স্মার্ট কৃষক তৈরি করে টেকসই কৃষি উন্নয়ন নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা ও খাদ্যে স্বয়ংস্পূর্ণতা অর্জন-ই হচ্ছে ফার্মার স্কুলের লক্ষ্য।

সিনজেনটার ফার্মার স্কুল থেকে ফসলের পুষ্টিব্যবস্থাপনা, সঠিক চাষ পদ্ধতি, বালাই দমন, সার প্রয়োগ কৌশল, মাটি স্বাস্থ্য, যান্ত্রিকীকরণ, এমনকিগবাদিপশু, মৎস্য ব্যবস্থাপনাসহ কৃষকদের আয় বর্ধনমূলক কর্মকান্ডে অন্তর্ভূক্তিকরনে বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ নেন সুলেখা।

প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তিনি পান কৃষি ঋণ এবং অভিজ্ঞ মেন্টরদের পরামর্শ। ফল হাতে নাতে মিলল। বাড়ির পেছনের ছোট্ট একটুকরো জমিতে শুরু করা চাষাবাদ আজ ১৬ বিঘা জমিতে পরিণত হয়েছে, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাতটি বড় আমের বাগান। গড়ে উঠে ছোট্ট এক গরুরখামার। বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রান্তরে কৃষিকাজ এমন অসংখ্য নারীর জন্য শুধু পেশানয়, এটি টিকে থাকার সংগ্রাম, আত্মমর্যাদার লড়াই এবং স্বপ্ন পূরণের পথ। সুলেখার এই সাফল্য কেবল তার নিজের নয়, আজ তিনি জাতীয় পর্যায়ে ‘জয়িতা’ পুরস্কারে ভূষিত। এখন তিনি অন্য নারী কৃষকদের পরামর্শদাতা এবং একজন সফল কমিউনিটি লিডার।

সুলেখার সম্পর্কে চারঘাট উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএও) জনাবজান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, সুলেখা সত্যিই একজন জয়িতা, যিনি দু:খ, কষ্ট ও দারিদ্র্যতাকে জয় করেছেন নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে। তিনি এলাকার অন্য নারীদের জন্য উদাহরণ। সিনজেনটা ফার্মার স্কুল তার কৃষিকাজে যে উৎসাহ ও সহায়তা দিয়েছে তা প্রশংসনীয়।

সিনজেনটা ফার্মার স্কুল কেবল একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নয় এটি একটি কৃষি ইকোসিস্টেম, যেখানে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও, দাতাসংস্থা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান একত্রে কৃষকদের পাশে কাজ করছে। মাত্র দুই বছরে প্রায় ১,৫০০ ক্ষুদ্র চাষি বিভিন্ন প্রশিক্ষণের আওতায় এসেছেন যার মধ্যে প্রায় ২৫-৩০ শতাংশই নারী। এটি দেশের কৃষিতে নারীর অন্তর্ভুক্তিমূলক অগ্রগতির এক ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।

সুলেখা জানান,‘ফার্মার স্কুলে আমি ফসলের পুষ্টি, চাষাবাদের আধুনিক পদ্ধতি, পোকামাকড় দমন ও সার প্রয়োগের সঠিক কৌশল শিখেছি। এই জ্ঞান আমার ফলন বাড়িয়েছে, খরচ কমিয়েছে এবং আমাকে আত্মবিশ্বাসী করেছে।’

বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষক পরিবারের মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশই ক্ষুদ্র চাষি, যারা দুই একর বা তার কম জমিতে চাষ করেন। ধান, গম, ভুট্টা, সবজি, আমসহ নানা ফসল উৎপাদন করে তারা শুধু নিজেদের পরিবার নয়, দেশের কৃষি অর্থনীতির মূলভিত্তি হয়ে উঠেছেন। কিন্তু অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, আধুনিক কৃষি প্রশিক্ষণের অভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ক্ষরা ও বন্যার মতো চ্যালেঞ্জ তাদের প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত করে।

সিনজেনটা বাংলাদেশ-এর কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি বিভাগের পরিচালক, মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম, বলেন, ‘আমাদের ফার্মার স্কুল ইতোমধ্যে স্থানীয় কৃষক সমাজে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। কৃষক-কৃষাণীরা নিয়মিত ভাবে এখানে এসে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে তাদের কৃষি সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান পাচ্ছেন। আধুনিক কৃষিসম্পর্কিত বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষকরা হয়ে উঠছেন আরও দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী ও স্বনির্ভর। এছাড়া, নারী কৃষকদের জন্য আয়োজিত নারী ক্ষমতায়ন বিষয়ক প্রশিক্ষণ তাদের সামাজিক ও মানসিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।’

ফার্মার স্কুলের উপকারভোগী সুলেখা আজ শুধু একজন সফল কৃষক নন, তিনি অন্য নারীদের জন্য প্রেরণার বাতিঘর। তিনি বলেন, ‘আমি চাই আমাদের গ্রামের আরও নারীরা কৃষিতে এগিয়ে আসুক। সঠিক প্রশিক্ষণ ও সাহস থাকলে নারীরাও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।’

নিজের এই সাফল্য নিয়ে তিনি গর্বের সঙ্গে বলেন,‘আজ আমি শুধু আমার পরিবারকে সহযোগিতা করছিনা, আমি একজন স্বাবলম্বী কৃষক হিসেবে সমাজে সম্মান অর্জন করেছি।’

সুলেখা খাতুন সহ আরো হাজার গ্রামীন নারীর পাশে থেকে যেভাবে ‘ফার্মার স্কুল’ নিরলস ভাবে কাজ করে চলেছে, তা কেবল উত্তরবঙ্গ নয়, সারা দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির পাশাপাশি দেশের টেকসই কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করছে।

নারীসাফল্য