ইফতারে প্রতিদিন জিলাপি? জেনে নিন এর স্বাস্থ্য ঝুঁকি

রোজা রেখে ভাজাপোড়া খাওয়া একটা রেওয়াজ বলা চলে। ইফতারে ছোলা-মুড়ি- বেগুনি-আলুর চুপ ছাড়া অনেকের চলেই না। এক্ষেত্রে অনেকে সঙ্গে রাখে জিলাপীকেও। তবে সারাদিন রোজার পর খালি পেটে জিলাপি খেলে শরীরে কী ঘটে, তা জানা জরুরি—বিশেষ করে কারও যদি ডায়াবেটিস বা গ্যাস্ট্রিকের মতো সমস্যা থেকে থাকে।
আমরা সবাই কম- বেশি এর স্বাস্থ্য ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে জানি। এর পরেও খাই। এই আলুর চপ, বেগুনি, পাকোড়া, মুখরোচক কাবাবগুলোর মাঝে মিষ্টি একটি খাবার হল জিলাপি। পুরো বছর খাওয়া না হলেও ইফতারে ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এটি। খাদ্যপথ্য ও আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ আলমগির আলম জানান, ‘একটা ১০০ গ্রাম আকারের জিলাপি খেলে ডায়াবেটিস রোগীদের ৭ পয়েন্ট সুগার বেড়ে যায়। ফলে ইফতারে জিলাপি খুব স্বাস্থসম্মত খাবার নয়। জিলাপি মূলত পরিশোধিত চিনি বা রিফাইন্ড সুগার, ময়দা এবং ডুবো তেলে ভাজার মাধ্যমে তৈরি হয়। এ ধরণের খাবার শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।’
জিলাপির ক্ষতিকর দিক
১।জিলাপিতে অতিরিক্ত চিনি ও কার্বোহাইড্রেট থাকে। এটি খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়ে এবং কমে। এতে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দ্রুত ক্ষুধা লাগে যা অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা বাড়ায়।
২।এটি উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার, যা ওজন বাড়ার অন্যতম কারণ হতে পারে। ১০০ গ্রাম জিলাপিতে ৩০০ থেকে ৪০০ ক্যালরি থাকে। এই পরিমাণ ক্যালরি শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমার কারণ।
৩।জিলাপি ভাজতে সাধারণত ডালডা বা আগে ব্যবহৃত তেল পুনরায় ব্যবহার করা হয়। এ ধরণের তেল ট্রান্সফ্যাট তৈরি করে। এই ফ্যাট কোলেস্টেরল বাড়িয়ে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
৪।জিলাপি তৈরিতে ব্যবহৃত রিফাইন্ড ফ্লাওয়ার বা ময়দা ও চিনি হজমে সমস্যা সৃষ্টি করে। এটি পাকস্থলীতে গ্যাস, অম্বল ও অ্যাসিডিটির সমস্যা তৈরি করে।
৫।অতিরিক্ত চিনি শরীরের পানিশূন্যতা বাড়ায় এবং এটি রোজার পর শরীরের জন্য আরও ক্ষতিকর।
কেন মিষ্টি খাওয়ার প্রবণতা
রমজান মাসে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর ইফতারে মিষ্টি জাতীয় খাবারের প্রতি আমাদের প্রবল আকর্ষণ তৈরি হয়। কারণ সারাদিন না খেয়ে থাকার পর আমাদের শরীর শক্তির দ্রুত উৎস খোঁজে। অনেকে মনে করেন পুষ্টির অভাব থেকে এই আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়, কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে অভ্যাস, মানসিক চাপ বা নির্দিষ্ট সময়ের খাদ্যাভ্যাসই এর জন্য বেশি দায়ী। এছাড়া ডায়েটে পর্যাপ্ত ফাইবার ও প্রোটিন না থাকলেও শরীর মিষ্টির মাধ্যমে দ্রুত শক্তি পেতে চায়। তবে জিলাপি বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত মিষ্টির বদলে শরীরের জন্য এমন কিছু প্রয়োজন যা রক্তে শর্করার মাত্রা হুট করে বাড়িয়ে আবার কমিয়ে দেবে না। কৃত্রিম চিনিযুক্ত খাবারের বদলে শরীরের আসল চাহিদা মেটাতে পারে প্রাকৃতিক উপাদান। এই চিনি বা মিষ্টি জাতীয় খাবারের তীব্র আকাঙ্ক্ষা বা ‘সুগার ক্রেভিং’ অনেকের জন্যই একটি বড় সমস্যা।
জিলাপি নয় তাহলে কি?
অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠতে পারে জিলাপি না খেলে কি খাবেন। তাদের জন্যও আছে বেশ স্বাস্থ্যসম্মত কিছু খাবার।

প্রাকৃতিক মিষ্টি ও ফলমূল: মিষ্টির বদলে আম বা আঙুর খেতে পারেন। এতে থাকা প্রাকৃতিক চিনি ও ফাইবার শরীরের কোনো ক্ষতি ছাড়াই মিষ্টির তৃষ্ণা মেটায়। এছাড়া ব্লুবেরি বা স্ট্রবেরি মিষ্টি হলেও এতে ফাইবার বেশি থাকায় রক্তে শর্করা হঠাৎ বাড়িয়ে দেয় না। অন্যদিকে খেজুর ও আলু বোখার আঁশযুক্ত এবং অত্যন্ত পুষ্টিকর। খেজুর তাৎক্ষণিক শক্তি যোগায়, যা ইফতারের জন্য আদর্শ। মিষ্টি আলু জটিল শর্করা ও ফাইবারে ভরপুর, যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে।
প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার: ডিম, মাছ ও মাংস ইত্যাদি প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবা। এগুলো ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন বৃদ্ধি করে এবং মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছা কমিয়ে দেয়। ইফতার ও সেহারিতে এই ধরণের খাবার রাখার চেষ্টা করবেন। এছাড়া ডাল ও শিম খেতে পারেন। বিশেষ করে মসুর ডাল ফাইবার ও প্রোটিনের দারুণ উৎস, যা রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখে।
দই: চিনি ছাড়া টক দই ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনে সমৃদ্ধ, যা ক্ষুধা কমাতে সাহায্য করে।
চিয়া সিডস: এটি পেটে গিয়ে ফুলে ওঠে এবং দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে।
আস্ত শস্য: লাল চাল বা ওটস ফাইবার ও ভিটামিন-বি সমৃদ্ধ, যা হজমে সাহায্য করে এবং বারবার খাওয়ার ইচ্ছা কমায়।



