নারীর চোখে জ্বালানি রূপান্তর

বাংলাদেশের জ্বালানি নীতি ও পরিকল্পনায় সবচেয়ে বড় ঘাটতি হিসেবে সামনে আসে নারীর সীমিত অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের অভাব। জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি, মাস্টারপ্ল্যান কিংবা বিনিয়োগ কাঠামোয় নারীকে মূলত ‘ভোক্তা’ বা ‘সুবিধাভোগী’ হিসেবেই দেখা হয়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী, প্রযুক্তিবিদ, উদ্যোক্তা বা উদ্ভাবক হিসেবে তাদের অবস্থান এখনও প্রান্তিক। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর্মীদের প্রায় ৩২ শতাংশ নারী হলেও বাংলাদেশে এ হার ১০ শতাংশেরও কম।
উন্নয়ন সূচকে অগ্রগতি সত্ত্বেও দেশের বিপুলসংখ্যক নারী এখনও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও উৎপাদনশীল খাতে কাঠামোগত বঞ্চনার শিকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জেন্ডার সংবেদনশীলতা কোনো অতিরিক্ত বিষয় নয় বরং টেকসই উন্নয়নের জন্য এটি অপরিহার্য।
জ্বালানি দারিদ্র্য ও অদৃশ্য শ্রম
বাংলাদেশের উন্নয়ন ও রূপান্তরের পথে একটি বড় কিন্তু প্রায় ‘অদৃশ্য’ বাধা হলো নারীর কাঠামোগত বঞ্চনা। দীর্ঘদিন ধরে সম্পত্তির অধিকার, প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার, আর্থিক তথ্য ও সেবা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ থেকে নারীরা বঞ্চিত। এর প্রভাব শুধু নারীর ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ নেই, বরং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের চাকাকে ধীর করে দিচ্ছে।
জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে এই বৈষম্য আরও প্রকট। দেশে বিদ্যুৎ সুবিধা প্রায় সবার দোরগোড়ায় পৌঁছালেও বিপুলসংখ্যক নারী এখনও ‘জ্বালানি দারিদ্র্যের’ শিকার। গ্রামের অনেক নারীকে প্রতিদিন ৫ ঘণ্টারও বেশি সময় ব্যয় করতে হয় কেবল রান্না ও জ্বালানি সংগ্রহে। ফলে তাদের পড়াশোনা, আয়মূলক কাজ ও নেতৃত্বে অংশ নেওয়ার অমূল্য সময়টুকু হারিয়ে যায়।
এখনও দেশের মাত্র ২৮ শতাংশ মানুষ দূষণমুক্ত রান্নার জ্বালানি ব্যবহার করতে পারেন। বিশাল সংখ্যক পরিবার ক্ষতিকর বায়োমাস জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, যার ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি সরাসরি বহন করতে হয় নারীদের। পরিসংখ্যান বলছে, নারীরা প্রতিদিন গড়ে ৫.৯ ঘণ্টা বিনামূল্যে গৃহস্থালি কাজ ও পরিচর্যায় ব্যয় করেন, যার বড় অংশই রান্না ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত। তাই জ্বালানি নীতিকে শুধু ‘বিদ্যুৎ পৌঁছানোর’ বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই–এটি সরাসরি নারীর সময়, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত।
পরিবর্তনের উদ্যোগ
নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করলে কোনো পরিবর্তনই টেকসই হবে না। জ্বালানি খাতে ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রূপান্তরের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের দাবি মাত্র—
- জাতীয় জ্বালানি নীতিতে নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
- বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানো।
- জীবাশ্ম জ্বালানির ভর্তুকি কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি।
- নতুন কয়লা, গ্যাস ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন না দেওয়া।
- ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ১০০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ।
- নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ২০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
ন্যায্য রূপান্তরের প্রশ্ন
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জ্বালানি রূপান্তর কেবল প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয় বরং এটি একটি সামাজিক রূপান্তর। নারী, আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার ও নেতৃত্ব নিশ্চিত না হলে এই রূপান্তর টেকসই হবে না।
জ্বালানি অবকাঠামো থেকে অর্জিত সুফল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো এবং জেন্ডার-সংবেদনশীল নীতি বাস্তবায়নই পারে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে। নারীর চোখে জ্বালানি রূপান্তর তাই কেবল সমতার দাবি নয়। এটি ন্যায্য ও টেকসই ভবিষ্যতের পূর্বশর্ত।



