বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
জীবনযাপন

সেহেরিতে অসতর্কতা নয়, রান্না শেষে চুলা বন্ধ করছেন তো?

_125987714_gettyimages-1347890261

আমাদের বাসার রান্নাঘর, আমাদের জন্য কখনো কখনো সবচেয়ে বড় ঝুঁকির উৎস হয়ে উঠতে পারে, আমাদেরই সামান্য অসতর্কতার কারণে। রান্না শেষে চুলা ঠিকমতো বন্ধ করা হচ্ছে কি না, সে প্রশ্নটি আমরা ক’জন নিজেকে করি? ব্যস্ততা, ক্লান্তি কিংবা অসচেতনতার কারণে অনেক সময়ই এই ছোট্ট কাজটিই বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

রোজার মাসে সেহেরির সময়টুকু যেন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলা। রাতের শেষ প্রহরে অল্প সময়ে রান্না, খাওয়া ও প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে এক ধরনের তাড়াহুড়ো কাজ করে। কিন্তু এই তাড়াহুড়োর মাঝেই লুকিয়ে থাকে অগ্নিকাণ্ড ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেহেরির রান্নায় সবচেয়ে বড় সুরক্ষা হলো সচেতনতা এবং কাজ শেষ হওয়ার পর নিশ্চিতভাবে চুলা ও গ্যাস সংযোগ বন্ধ করা।

সেহেরির সময় ঘুমের প্রভাবকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। আধোঘুমে চুলায় হাঁড়ি বসিয়ে অন্য ঘরে চলে যাওয়া বা মোবাইলে ব্যস্ত হয়ে পড়া বিপজ্জনক। আগুন জ্বালানো অবস্থায় রান্নাঘর কখনোই ফাঁকা রাখা যাবে না। পরিবারের অন্য সদস্যদেরও এ বিষয়ে সচেতন করা দরকার, যেন কেউ অসতর্কভাবে চুলা স্পর্শ না করে। রান্নাঘরের পরিবেশ নিরাপদ রাখা সমান গুরুত্বপূর্ণ। চুলার পাশে ঝুলে থাকা কাপড়, টিস্যু, কাগজের প্যাকেট বা প্লাস্টিকের সামগ্রী আগুনের সংস্পর্শে এলে মুহূর্তেই দাহ্য হয়ে উঠতে পারে। গ্যাসের গন্ধ পেলেই দ্রুত জানালা-দরজা খুলে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে এবং কোনো অবস্থাতেই ম্যাচ বা লাইটার জ্বালানো যাবে না। বরং দ্রুত দরজা-জানালা খুলে দিন, রেগুলেটর বন্ধ করুন এবং প্রয়োজন হলে বাইরে গিয়ে সহায়তা নিন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে দ্রুত জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ বা নিকটস্থ ফায়ার স্টেশনে যোগাযোগ করুন। রাইস কুকার, হিটার বা ওভেনে অতিরিক্ত খাবার গরম করা থেকে বিরত থাকুন। দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার না করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

রান্না ঘরে আগুন লাগলে, আগুন যদি রান্না ঘরের তেল বা গ্রিজ থেকে সৃষ্টি হয়, তাহলে তার উপর বেকিং সোডা বা লবণ ঢেলে দেওয়ার চেষ্টা করুন। এটা যদি রান্না করার পাত্রে সূত্রপাত হয় তাহলে তা ঢাকনা দিয়ে দ্রুত ঢেকে দিন। জ্বলতে থাকা কড়াইয়ে পানি ঢালবেন না বা ফায়ার এক্সটিংগুইশার ব্যবহার করবেন না। চাইলে স্মোক ডিটেক্টর স্থাপন করুন। আগুন লাগার প্রাথমিক পর্যায়ে এটি আপনাকে সতর্ক করবে এবং বড় দুর্ঘটনার হাত থেকে বাঁচাতে সাহায্য করবে। তাই রান্নাঘরে স্মোক ডিটেক্টর লাগাতে পারেন। তবে নিয়মিতভাবে এর ব্যাটারি পরীক্ষা করা জরুরি। ফায়ার এলার্ম বেজে উঠলে আগুনের উৎস খুঁজে বের করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

Advertisements

আরও একটি বড় সমস্যা হলো যন্ত্রপাতির অবহেলা। গ্যাস পাইপ বছরের পর বছর বদলানো হয় না, রেগুলেটর ঢিলে হয়ে যায়, ক্লিপ মরিচা পড়ে দুর্বল হয়— কিন্তু আমরা চোখ এড়িয়ে যাই। অনেকেই জানেন না, গ্যাস পাইপের একটি নির্দিষ্ট আয়ু আছে। সেটি শক্ত হয়ে গেলে বা ছোট ফাটল দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে বদলানো উচিত। নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করলে ঝুঁকি অদৃশ্যভাবেই বাড়তে থাকে। অন্তত ছয় মাস পরপর গ্যাস পাইপ ও রেগুলেটর পরীক্ষা করুন। সাবান পানি দিয়ে সংযোগস্থলে বুদবুদ ওঠে কি না দেখে নেওয়া একটি সহজ পদ্ধতি। সমস্যা মনে হলে দেরি না করে অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ানের সাহায্য নিন। মনে রাখবেন, কয়েকশ টাকার যন্ত্রাংশ বাঁচাতে গিয়ে কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি ডেকে আনা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন ২০০৩ অনুসারে, ছয়তলার চেয়ে বেশি উচ্চতার আবাসিক ভবন এবং যেকোনো উচ্চতার অনাবাসিক ভবনের নকশা অনুমোদন ও অনুমোদিত নকশা সংশোধনের জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালকের ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। কেবল তা-ই নয়, জাতীয় ভবন নির্মাণ বিধিমালা ২০২০ অনুসারে, এসব ভবন বা স্থাপনা ব্যবহার শুরু করার আগেই ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনার বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কার্যালয়ের অনুমোদন নিতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়—এটি দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।একটি দুর্ঘটনা শুধু ইট-কাঠের ক্ষতি করে না, মানসিক আঘাতও রেখে যায় দীর্ঘদিন।আজ থেকেই নিয়ম করুন— রান্নাঘর ছাড়ার আগে একবার ফিরে তাকাবেন। নিশ্চিত হবেন, আগুন নিভেছে, গ্যাস বন্ধ, সবকিছু নিরাপদ। এই ছোট্ট দায়িত্বশীল আচরণই আপনার ঘরকে রাখবে উষ্ণতায়, কিন্তু ঝুঁকিমুক্ত নিরাপত্তায়।

Advertisements