হঠাৎ ভূমিকম্প হলে কী করবেন?

প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর মধ্যে ভয়াবহ হলো ভূমিকম্প। অন্যান্য বিপর্যয়ের আগে কোনো না কোনো সতর্কবার্তা পাওয়া যায়, কিন্তু ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে এমন পূর্বাভাস সচরাচর পাওয়া যায় না। ফলে মুহূর্তের মধ্যে ব্যাপক জান-মালের ক্ষতি ঘটে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ভূমিকম্পের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় জনমনে আতঙ্ক বাড়ছে। ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, “বাংলাদেশ কম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ হলেও ঝুঁকির দিক দিয়ে খুব উপরে রয়েছে। যে পরিমাণ শক্তি ইন্ডিয়ান-বার্মা প্লেটের সংযোগ স্থলে জমা হয়ে আছে, সেই শক্তিটা যদি বের হয় তাহলে ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে।
ভূমিকম্প পৃথিবীর অভ্যন্তরে সঞ্চিত শক্তির আকস্মিক নির্গমনের ফলস্বরূপ সংঘটিত একটি ভূ-প্রাকৃতিক ঘটনা। পৃথিবীর ভূত্বক অখণ্ড নয়; এটি কয়েকটি বৃহৎ টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত, যা গতিশীল অবস্থায় রয়েছে। এই প্লেটগুলো কখনও পরস্পরের দিকে অগ্রসর হয়, কখনও দূরে সরে যায়, আবার কখনও পারস্পরিক ঘর্ষণের মাধ্যমে পাশাপাশি সঞ্চালিত হয়। প্লেটগুলোর সংযোগস্থল বা ফল্ট লাইনের বরাবর দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল পরিমাণ চাপ সঞ্চিত হতে থাকে। ভূগর্ভে জমে থাকা এই শক্তি যখন শিলাস্তরের সহনক্ষমতা অতিক্রম করে, তখন তা আকস্মিকভাবে মুক্তি পায়। এর ফলে ভূগর্ভ থেকে উৎপন্ন কম্পন তরঙ্গ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং পৃথিবীর পৃষ্ঠে অনুভূত হয়। এই আকস্মিক কম্পনই ভূমিকম্প নামে পরিচিত। অর্থাৎ, ভূগর্ভের অভ্যন্তরে সঞ্চিত শক্তির হঠাৎ নির্গমনের ফলে পৃথিবীর পৃষ্ঠে যে কম্পন সৃষ্টি হয়, সেটিই ভূমিকম্প। এটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও মানবসমাজ ও অবকাঠামোর জন্য তা হুমকিস্বরূপ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের প্রভাষক জাওয়াদ ইবনে ফরিদ বলেন, ‘ভূমিকম্প প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে বিভ্রান্তি ও অপতথ্য।’
ভূমিকম্পের সময় করণীয়ঃ
ভূকম্পন অনুভূত হলে আতঙ্কিত হবেন না। ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) এবং আমেরিকান রেড ক্রসের মতে, ভূমিকম্পের সময় বেশিরভাগ মানুষ আঘাত পায় উপর থেকে পড়া জিনিসপত্র (কাচ, বইয়ের তাক, ছোট বস্তু) বা দৌড়ানোর সময় পড়ে গিয়ে। নিজেকে রক্ষা করতে, তাৎক্ষণিকভাবে এই তিনটি ধাপ অনুসরণ করুন : ড্রপ (বসা বা শোয়া), কভার (ঢাকা) ও হোল্ড অন (ধরা)।
বসা বা শোয়া : অপেক্ষা করবেন না। মাটি কাঁপতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটু ও হাতের উপর ভর করে বসে পড়ুন বা শুয়ে পড়ুন। এই অবস্থান আপনাকে ভূমিকম্পের ঝাঁকুনিতে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করবে। আবার হামাগুড়ি দিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে যেতে পারবেন।
ঢাকা : হাত দিয়ে মাথা ও ঘাড় ঢেকে ফেলুন। যদি আশেপাশে একটি মজবুত টেবিল বা ডেস্ক থাকে, তবে সেটির নিচে হামাগুড়ি দিয়ে চলে যান। যদি কোনো আশ্রয় না থাকে, তবে ভেতরের দেয়ালের কাছে যান। এ সময় জানালার কাছে থাকা যাবে না। আর শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো রক্ষা করার জন্য হাঁটু গেড়ে বসে সামনের দিকে ঝুঁকুন। এটি আপনাকে উপর থেকে পড়া ধ্বংসাবশেষ, কাঁচ ভাঙা ও আলগা প্লাস্টার থেকে রক্ষা করবে।
ধরা : যেখানে আশ্রয় নেবেন আশপাশে ভারী কিছু পেলে এক হাত দিয়ে শক্তভাবে ধরে থাকুন। কারণ কম্পন বেশি শক্তিশালী হলে ভারী আসবাবপত্রও সরে যায়। ধরে থাকলে আপনার ‘ঢাল’ আপনার উপরেই থাকবে। যদি কোনো আশ্রয় না থাকে, তবে দুই হাত দিয়ে মাথা ও ঘাড় ধরে থাকুন।

আপৎকালীন ব্যাগ : বাঁচার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র
কম্পন বন্ধ হওয়ার পর বিশেষ করে কাঠামোগত ক্ষতি বা আগুনের ঝুঁকি থাকলে আপনাকে ভবন থেকে বেরিয়ে যেতে হতে পারে। এই সময়ে একটি আপৎকালীন ব্যাগ জীবন রক্ষাকারী হতে পারে। জরুরি জিনিসপত্র দিয়ে এটি আগেই গুছিয়ে রাখতে হবে এবং দরজার কাছে বা সহজে পাওয়া যায় এমন স্থানে রাখতে হবে। ব্যাগে থাকতে পারে – পানি, দীর্ঘক্ষণ শক্তি জোগানো খাবার, অতিরিক্ত ব্যাটারিসহ একটি উন্নতমানের টর্চলাইট, বাঁশি – আপনি যদি আটকে পড়েন তবে উদ্ধারকারীদের সংকেত দেওয়ার জন্য , গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র,পাওয়ার গ্রিড ব্যর্থ হলে এটিএম বুথ কাজ নাও করতে পারে এজন্য কিছু নগদ অর্থ ।
আপনি যদি ঘরের ভেতরে থাকেন এবং যদি ঘর থেকে বের হওয়া না যায়, সে ক্ষেত্রে ইটের গাঁথুনি দেওয়া পাকা ঘর হলে ঘরের কোণে এবং কলাম ও বিমের তৈরি ভবন হলে কলামের গোড়ায় আশ্রয় নিতে হবে। যেকোনো মূল্যে লিফট এড়িয়ে চলুন। ভূমিকম্পের সময় জানালা দিয়ে লাফ দেবার চেষ্টা থেকে বিরত থাকা উচিত। বিদ্যুৎ চলে যেতে পারে, পাইপ ফেটে যেতে পারে বা অ্যালার্ম বাজতে পারে— এগুলো মাথায় রাখতে হবে।
ঝাঁকুনি বন্ধ হওয়ার পর কী করবেন
‘মেইন শক’ বা মূল ভূমিকম্পের আগে এবং পরে মৃদু থেকে মাঝারি আরো কিছু ভূমিকম্প হতে পারে যেগুলো ‘ফোরশক’ এবং ‘আফটার শক’ নামে পরিচিত। সতর্ক না থাকলে এগুলো থেকেও বড় বিপদ হয়ে যেতে পারে। সাধারণত কোনো বড় ভূমিকম্পে ‘আফটার শক’ প্রথম ঘণ্টার মধ্য থেকে শুরু করে কয়েক দিনের মধ্যে হতে পারে। ঝাঁকুনি বন্ধ হওয়ার পর অন্য কোনো বিপদ আছে কি না পরীক্ষা করুন। গ্যাস লিকেজ, রাসায়নিক বিকিরণ বা ক্ষতিগ্রস্ত বৈদ্যুতিক তারের সন্ধান করুন। যদি গ্যাস লিকেজের সন্দেহ করেন তবে একটি জানালা খুলে সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে যান। দিয়াশলাই ব্যবহার করবেন না বা বৈদ্যুতিক সুইচ চালু করবেন না। এ সময় স্ফুলিঙ্গ বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। আফটারশকের জন্য প্রস্তুত থাকুন। সেক্ষেত্রে আবারও ‘ড্রপ, কভার ও হোল্ড অন’র জন্য প্রস্তুত থাকুন।
আপনি যদি গাড়িতে থাকেন তবে, নিরাপদ হলে গাড়ি থামিয়ে রাস্তার পাশে নিন এবং গাড়ির ভেতরেই থাকুন। ভবন, গাছ, ওভারপাস বা বৈদ্যুতিক তারের নিচে বা খুব কাছে গাড়ি থামাবেন না। অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত সেতু বা ওভারপাসের ওপর দিয়ে বা নিচ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। ভূমিকম্প থামার পর সতর্ক হয়ে চলাচল করুন এবং রাস্তা বা সেতুতে ফাটল বা কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিনা খেয়াল করুন।
ধ্বংসস্তুপে আটকে পড়লে করণীয়
- বিম, দেয়াল, কংক্রিটের ছাদ ইত্যাদির মধ্যে শরীরের কোনো অংশ চাপা পড়লে, বের হওয়ার সুযোগ যদি না-ই থাকে, তবে বেশি নড়াচড়া করা যাবে না। তাতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হতে পারে।
- ম্যাচ জ্বালাবেন না। দালান ধসে পড়লে গ্যাস লিক হয়ে থাকতে পারে।
- চিৎকার করে ডাকাডাকি শেষ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করুন। কারণ, চিৎকারের সময় মুখে ক্ষতিকারক ধুলাবালি ঢুকে যেতে পারে। পাইপে বা দেয়ালে বাড়ি দিয়ে বা মুখে শিস বাজিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করতে পারেন।
এছাড়াও, ভূমিকম্প মোকাবেলায় জন্য পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ ও সচেতনতা তৈরির জন্য ফায়ার সার্ভিস কিছু পরামর্শ দিয়েছে।
- বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ২০২০ অনুযায়ী ভূমিকম্প প্রতিরোধী ভবন নির্মাণ।
- ঝুঁকিপূর্ণ ও পুরোনো ভবনগুলোর সংস্কার ও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ।
- বহুতল ও বাণিজ্যিক ভবনে অগ্নি প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা।
- ইউটিলিটি সার্ভিসের মধ্যে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের লাইনের সঠিকতা নিশ্চিত করা।
- ভূমিকম্প চলাকালীন সময়ে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে বিভিন্ন করণীয় সম্পর্কে নিয়মিত মহড়া অনুশীলন ও প্রচারের ব্যবস্থা করা।
- জরুরি টেলিফোন নম্বর যেমন- ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স, পুলিশ, হাসাপাতাল ও অন্যান্য জরুরি নাম্বারসমূহ ব্যক্তিগত পর্যায়ের পাশাপাশি সকল ভবন বা স্থাপনায় সংরক্ষণ করা এবং তা দৃশ্যমান স্থানে লিখে রাখা।
- ভলান্টিয়ার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দুর্যোগকালীন সময়ে কার্যকর ভূমিকা রাখা।
অবশ্যই, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যাচাই হয়নি এমন গুজব ছড়ানো এড়িয়ে চলুন, কারণ এমন সময়ে আতঙ্ক ভূমিকম্পের মতোই মারাত্মক হতে পারে। কেউ আহত হলে দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে যাবেন না। ভবনে ফাটল, ঝুলে থাকা দেয়াল, ভাঙা সিঁড়ি থাকলে ভেতরে প্রবেশ করবেন না। গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ লাইন পরীক্ষা করুন। সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করুন।



