ইসলামে সম্পদের হক: যাকাত ও ফিতরার বিধান

ইসলামে যাকাত ও ফিতরা—দুটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত। কিন্তু অনেকের মধ্যেই এ নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, যাকাত ও ফিতরা হয়তো একই বিষয় বা একটির মাধ্যমে অন্যটির দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। বাস্তবে ইসলামী শরিয়তে এই দুই ইবাদত আলাদা এবং প্রতিটির জন্য পৃথক বিধান ও শর্ত নির্ধারিত রয়েছে।
ইসলামী ফিকহবিদদের মতে, যাকাত এবং সদকাতুল ফিতর (ফিতরা) দুটি স্বতন্ত্র আর্থিক ইবাদত। একটির মাধ্যমে অন্যটি আদায় হয় না। অর্থাৎ কেউ যাকাত দিলে তার ফিতরার দায়িত্ব শেষ হয় না আবার ফিতরা দিলেও যাকাতের দায়িত্ব থেকে মুক্ত হওয়া যায় না। দুটির উদ্দেশ্য, সময় ও শর্ত ভিন্ন।
রমজান মাসের শেষে যে দান দেওয়া হয় তাকে বলা হয় সদকাতুল ফিতর বা ফিতরা। শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, ঈদুল ফিতরের দিন অর্থাৎ ১ শাওয়ালের ভোরে যার কাছে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের বাইরে নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ থাকে, তার ওপর ফিতরা ওয়াজিব হয়। এই সম্পদের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ সম্পদের ভিত্তিতে। এই সম্পদ নগদ অর্থ, সোনা, রুপা বা অন্য যেকোনো সম্পদের আকারে হতে পারে।
ফিতরার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই সম্পদের ওপর এক বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয়। অর্থাৎ ঈদের দিন ওই পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেই ফিতরা ওয়াজিব হয়ে যায়। একজন ব্যক্তি নিজের পক্ষ থেকে যেমন ফিতরা আদায় করবেন, তেমনি তার অধীনস্থ নাবালক সন্তানদের পক্ষ থেকেও ফিতরা দিতে হবে।
অন্যদিকে যাকাতের বিধান ভিন্ন। যাকাত ফরজ হয় এমন সম্পদের ওপর যা বর্ধনশীল বা বৃদ্ধি পায়। এর মধ্যে সাধারণত সোনা, রুপা, নগদ অর্থ, ব্যবসায়িক পণ্য এবং চারণভূমিতে পালিত গবাদিপশু অন্তর্ভুক্ত। এসব সম্পদের যেকোনো একটি বা একাধিক মিলিয়ে যদি মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদের পরিমাণ সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা বা সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণের মূল্যের সমান হয়, তবে সেই ব্যক্তির ওপর যাকাত ফরজ হয়।
তবে যাকাত ফরজ হওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আছে—এই সম্পদের ওপর পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হতে হবে। অর্থাৎ সম্পদ নির্ধারিত পরিমাণে পৌঁছানোর পর যদি তা এক বছর ধরে মালিকের কাছে থাকে, তখন যাকাত দিতে হবে।
ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, ফিতরার মূল উদ্দেশ্য হলো রমজান শেষে সমাজের দরিদ্র মানুষের প্রয়োজন পূরণ করা এবং ঈদের আনন্দে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। অন্যদিকে যাকাতের উদ্দেশ্য আরও বিস্তৃত—সমাজে সম্পদের ন্যায়সংগত বণ্টন নিশ্চিত করা, দারিদ্র্য কমানো এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা।
সুতরাং, যাকাত ও ফিতরা দুটিই ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত হলেও তাদের সময়, শর্ত ও উদ্দেশ্যের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। মুসলমানদের জন্য প্রয়োজন হলো এই পার্থক্যগুলো ভালোভাবে বোঝা এবং যথাসময়ে সঠিক নিয়মে উভয় ইবাদত আদায় করা।



