বাবার পথ ধরে রাজনীতিতে ৩ নারী, হলেন মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রী

বাংলাদেশের রাজনীতিতে পারিবারিক উত্তরাধিকার নতুন কোনো বিষয় নয়। দীর্ঘদিন ধরেই দেখা যায় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত নেতাদের সন্তানরা ধীরে ধীরে সেই পথেই এগিয়ে যান। নতুন সরকার গঠনের পর আবারও সেই চিত্র সামনে এসেছে। বাবার রাজনৈতিক পথ অনুসরণ করে তিন নারী এবার জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছেন। তারা হলেন আফরোজা খানম, শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং ফারজানা শারমিন। প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তারা মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন।
নতুন সরকার গঠনের সময় ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভায় মাত্র তিনজন নারী জায়গা পেয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের বাবাই দেশের রাজনীতিতে পরিচিত মুখ ছিলেন এবং কেউ কেউ মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন তাদের মেয়েরাও সেই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্র পরিচালনার অংশ হলেন।
এই তিনজনের মধ্যে আফরোজা খানম মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তিনি মানিকগঞ্জ-৩ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে এক লাখ ৬৭ হাজারের বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হন। স্বাধীনতার পর এই আসনে তিনিই প্রথম নারী সংসদ সদস্য। রাজনীতিতে তার পথচলা নতুন নয়। অনেক আগে থেকেই তিনি দলের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একসময় বাবার নির্বাচনী কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তার বাবা হারুনার রশিদ খান চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
আফরোজা খানমের পরিচয় শুধু রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি একজন ব্যবসায়ীও। বর্তমানে তিনি মুন্নু গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি তিন সন্তানের মা। রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা তাকে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হতে সহায়তা করেছে।
প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া শামা ওবায়েদ ইসলামের রাজনৈতিক যাত্রাও পারিবারিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। তিনি ফরিদপুর-২ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। তার বাবা কে এম ওবায়দুর রহমান ছিলেন বিএনপির তৃতীয় মহাসচিব এবং একজন সাবেক মন্ত্রী। বাবার মৃত্যুর পর রাজনীতিতে সক্রিয় হন শামা ওবায়েদ। দীর্ঘদিন ধরে তিনি দলের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অতীতে কয়েকবার নির্বাচনে অংশ নিলেও এবারই প্রথম তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পেরেছেন।
রাজনীতির পাশাপাশি তিনি ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত। তিনি একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পারিবারিক ঐতিহ্য, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা তাকে মন্ত্রিসভায় জায়গা পেতে সহায়তা করেছে।
মন্ত্রিসভায় জায়গা পাওয়া তৃতীয় নারী ফারজানা শারমিন নাটোর-১ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন এবং উত্তরাঞ্চল থেকে বিএনপির একমাত্র নারী সংসদ সদস্য হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। পেশায় তিনি একজন আইনজীবী এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে প্র্যাকটিস করেন। তার বাবা ফজলুর রহমান ছিলেন বিএনপির একজন প্রভাবশালী নেতা এবং একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি সমাজকল্যাণ ও যুব এবং ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছিলেন।
ফারজানা শারমিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। আইন পেশার পাশাপাশি রাজনীতিতেও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তার পথকে সহজ করেছে, তবে নিজের পরিচয় তৈরি করার জন্যও তাকে কাজ করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পারিবারিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা বহুদিনের। কেউ এটিকে অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখেন আবার কেউ মনে করেন এতে নতুন নেতৃত্ব উঠে আসার সুযোগ কমে যায়। তবে বাস্তবতা হলো রাজনীতির পরিবারে বেড়ে ওঠা মানুষদের কাছে রাজনীতির পরিবেশ, কৌশল এবং বাস্তবতা তুলনামূলকভাবে পরিচিত থাকে। ফলে তাদের সামনে রাজনীতিতে প্রবেশের পথও অনেক সময় সহজ হয়ে যায়।
নতুন মন্ত্রিসভায় এই তিন নারী সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। তারা শুধু বাবার পরিচয়ে রাজনীতিতে আসেননি বরং নির্বাচন করে জনগণের ভোটে সংসদে পৌঁছেছেন। এখন তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের দক্ষতা ও কাজের মাধ্যমে আলাদা পরিচয় তৈরি করা।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ এখনও খুব বেশি নয়। সেই বাস্তবতায় তিন নারীর মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এখন সময়ই বলে দেবে তারা দেশের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব রাখতে পারেন এবং নতুন প্রজন্মের জন্য কী ধরনের উদাহরণ তৈরি করেন।



