বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
স্পটলাইট

আসন পেলেও সিদ্ধান্তে নারীর উপস্থিতি কেন দুর্বল?

WhatsApp Image 2026-01-29 at 5.50.10 PM

সংসদে নারীর জন্য সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক দলগুলোতে নারী নেতৃত্ব তৈরির পথে বাধা হিসেবে অভিহিত করেছেন দেশের বিশিষ্টজন। তারা বলেছেন, জুলাই অভ্যুত্থানে নারীর অংশগ্রহণ ছিল পুরুষের প্রায় সমান সমান। অথচ আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণ অনেক কম, সব মিলিয়ে ৩ শতাংশ। জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলো ৫ শতাংশ করে নারী প্রার্থী করার লিখিত অঙ্গীকার করেও পূরণ করেনি। এখন তারা সংসদে সংরক্ষিত আসন ভাগাভাগি করে নিজেদের দায়মুক্ত করতে চাইছে। যে সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা অনেকটাই আলংকারিক, নারী নেতৃত্ব তৈরিতে বাধা।

গতকাল বুধবার রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ইসফেনদিয়ার জাহেদ হাসান মিলনায়তনে ‘রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব: সংকট ও সম্ভাবনা’শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তারা এসব কথা বলেন। গণমাধ্যম ঢাকা স্ট্রিম, নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম এবং ডেমোক্রেটিক বাংলাদেশ যৌথভাবে এই গোলটেবিলের আয়োজন করে।

বৈঠকে রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস বাংলাদেশের পরিচালক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. রওনক জাহান বলেন, সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নারী নেতৃত্ব তৈরি না করার সহজ পথ। যার মাধ্যমে তারা নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে। সংরক্ষিত নারী সদস্যরা জনগণের সরাসরি ভোটে নয়, ৩০০ পুরুষ এমপির ভোটে নির্বাচিত হন। ফলে তারা আসলে জনগণের, নাকি ওই ৩০০ পুরুষের প্রতিনিধিত্ব করছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব সংকট নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, নারী সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব মূলত শহরকেন্দ্রিক ও শিক্ষিত নারীদের হাতে। এর ফলে তৃণমূল বা কর্মজীবী নারীর সঙ্গে তাদের প্রকৃত যোগসূত্র তৈরি হয়নি; যা এখনও একটি বড় সমস্যা।

Advertisements

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ও সুজনের সম্পাদক অধ্যাপক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলো অনেকটা মাছ বাজারের দরাদরির মতো করে আসন্ন নির্বাচনে ৫ শতাংশ নারী মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে লিখিত অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু সেই অঙ্গীকারও তারা রক্ষা করেনি।
তিনি বলেন, বর্তমানে সংসদে নারীর জন্য যে সংরক্ষিত আসন পদ্ধতি আছে, তা অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়; বরং আলংকারিক। এই পদ্ধতির মাধ্যমে নির্বাচিতরা জনগণের কাছে নয়, বরং দলীয় নেতাদের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন। এখানে মনোনয়ন অনেকটা অনুগ্রহ হিসেবে দেওয়া হয়। যেখানে যোগ্যতার চেয়ে দলীয় কর্তাব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বা লেনদেন মুখ্য হয়ে ওঠে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন নারীদের জন্য ১০০টি ঘূর্ণায়মান আসনের প্রস্তাব করলেও দলগুলোর অনাগ্রহে আলোর মুখ দেখেনি। 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, নারীদের মাস্তান ও সন্ত্রাসী নেই বলেই তাদের মনোনয়ন দেওয়ার প্রবণতা কম। তবে কারও বাবা মন্ত্রী বা এমপি হলে, এমন নারীরা মনোনয়ন পেয়ে যান। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সংগ্রামের মাধ্যমে এই পর্যায়ে এসেছি আমি। অথচ শেষ বয়সে এসেও এখন আমার নির্বাচন করার আশাটা পূরণ হলো না। তিনি বলেন, আগে যাদের অস্তিত্ব ছিল না, তারাই সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে যান। আর যারা মাঠে লড়াই-সংগ্রাম করে এসেছেন, তাদের একজনকেও মনোনয়ন দেওয়া হয় না।    

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, নারীর নিরাপত্তা, সামাজিক ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন কারণে জামায়াত এবারের নির্বাচনে কোনো নারীকে প্রার্থী করতে পারেনি। তবে দলে তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় ‌পর্যন্ত ৪০ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করেছে। তিনি বলেন, সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগে জামায়াতের নারী কর্মীদের নির্বাচনী প্রচারে একটি দল আক্রমণ করেছে। আমরা নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা দিতে পারছি না। এ অবস্থায় কীভাবে আমরা বলি, তুমি নির্বাচনে প্রার্থী হও?  
স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা স্ট্রিম সম্পাদক গোলাম ইফতেখার মাহমুদ বলেন, অর্থনীতি, কৃষি ও প্রযুক্তি খাতে নারীরা অভাবনীয় সাফল্য পেলেও রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ উদ্বেগজনক হারে কমছে। যেখানেই সুযোগ তৈরি হয়েছে, নারীরা সেখানে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন। তবে সংসদ ও রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমশ কমছে।

নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরামের প্রতিনিধি মাহরুখ মহিউদ্দিনের সঞ্চালনায় গোলটেবিলে মূল প্রবন্ধ উত্থাপন করেন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য মীর নাদিয়া নিভিন। আরও বক্তব্য দেন জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশনের সদস্য ব্যারিস্টার তাজরিয়ান আকরাম হুসাইন, বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নাহিদুল খান সোহেল, কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক নিলোফার চৌধুরী মনি, জামায়াতে ইসলামীর নারী বিভাগের রাজনৈতিক বিষয়ক প্রধান অধ্যাপক ডা. হাবিবা আক্তার চৌধুরী, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতা সামান্থা শারমিন, হুমায়রা নূর, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি, সিপিবির কেন্দ্রীয় নারী সেলের সদস্য তাহমিনা ইয়াসমিন নীলা, এএপি বাংলাদেশের মুখপাত্র শাহরিন সুলতানা ইরা, সমাজকর্মী তাজনুভা জাবিন, ডাকসুর কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে সালমা, সাংবাদিক আকরামুল হক সায়েম প্রমুখ। নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জেসমিন টুলিও গোলটেবিলে উপস্থিত ছিলেন। 

Advertisements