বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
স্পটলাইট

সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়া এক মাসে কেমন বদল অস্ট্রেলিয়ার কিশোরদের জীবনে?

Untitled-3

অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার এক মাস পেরিয়েছে। এই এক মাসে অনেক কিশোর-কিশোরীর দৈনন্দিন জীবনে এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। সিডনির ১৪ বছর বয়সী অ্যামির কাছে এই সময়টা যেন নতুন করে নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ।

অ্যামি বলছে, বহু বছর পর এই প্রথম সে নিজেকে “মুক্ত” মনে করছে। এখন সে আগের তুলনায় অনেক কম সময় ফোন ব্যবহার করে এবং তার দৈনন্দিন রুটিনও বদলে গেছে।

তবে শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার প্রথম কয়েক দিন অ্যামি তীব্রভাবে অনলাইন অভ্যাসের টান অনুভব করেছিল। নিজের ডায়েরিতে সে লিখেছিল, “আমি জানতাম স্ন্যাপচ্যাট ব্যবহার করতে পারব না। তারপরও প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই অভ্যাসের বশে অ্যাপটা খোলার জন্য হাত চলে যেত।”

নিষেধাজ্ঞার চতুর্থ দিনে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটকসহ প্রায় ১০টি প্ল্যাটফর্ম যখন ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তখন অ্যামি প্রথমবারের মতো ভাবতে শুরু করে—স্ন্যাপচ্যাটের প্রতি এই টান আসলে কতটা গভীর।

Advertisements

সে লিখেছে, “বন্ধুদের স্ন্যাপ পাঠাতে না পারায় মন খারাপ হয় ঠিকই। কিন্তু অন্যভাবে তো তাদের সঙ্গে কথা বলা যাচ্ছে। আর সবচেয়ে ভালো লাগছে—আর ‘স্ট্রিক’ ধরে রাখার চিন্তা নেই।”

স্ন্যাপচ্যাটের ‘স্ট্রিক’ ফিচারটি অনেকের কাছেই ভয়ংকর রকমের আসক্তির কারণ। প্রতিদিন একে অপরকে ছবি বা ভিডিও পাঠিয়ে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হয়, যা কখনো কখনো বছরের পর বছর চলতে থাকে।

ষষ্ঠ দিনে এসে অ্যামির মধ্যে স্ন্যাপচ্যাটের টান কিছুটা কমতে শুরু করে। ১২ বছর বয়সে প্রথম এই অ্যাপ নামানোর পর থেকে সে দিনে বহুবার এটি খুলত। সে লিখেছে, “আগে স্কুল থেকে ফিরে সোজা স্ন্যাপচ্যাটে ঢুকতাম। এখন সেটা না পেরে বাইরে দৌড়াতে বের হয়েছি।”

এক মাস পর অ্যামির অভ্যাস প্রায় পুরোপুরি বদলে গেছে।

সে বলেছে, “আগে স্ন্যাপচ্যাট খোলা ছিল আমার রুটিন। তারপর ইনস্টাগ্রাম, তারপর টিকটক—এভাবে অ্যালগরিদমের মধ্যে পড়ে কখন সময় চলে যেত বুঝতাম না। এখন আমি অনেক কম ফোন ব্যবহার করি, শুধু দরকার হলে।”

অ্যামির এই অভিজ্ঞতা অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের জন্য নিশ্চয়ই আশার খবর। নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আগে তিনি শিশু-কিশোরদের এই অভ্যাস ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। অনলাইন হয়রানি ও ক্ষতিকর কনটেন্ট থেকে কিশোরদের রক্ষা করতেই সরকার এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়।

গত ১০ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া আইন অনুযায়ী, কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান যদি ১৬ বছরের কম বয়সীদের তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে সরাতে যথাযথ ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে তাদের সর্বোচ্চ ৫০ মিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার জরিমানা গুনতে হতে পারে।

সরকার আশা করেছিল, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে কিশোর-কিশোরীরা খেলাধুলা, বই পড়া বা গান শেখার মতো কাজে বেশি সময় দেবে। তবে সবার ক্ষেত্রে বাস্তবতা ঠিক তেমন নয়।

১৩ বছর বয়সী আহিল জানায়, তার জীবনে খুব একটা কিছু বদলায়নি। সে আগের মতোই প্রতিদিন প্রায় আড়াই ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কাটাচ্ছে। ভুয়া জন্মতারিখ ব্যবহার করে সে এখনো স্ন্যাপচ্যাট ও ইউটিউব চালায়। এ ছাড়া তার বেশির ভাগ সময় কাটে রবলক্স ও ডিসকর্ডে, যেগুলো এই নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে।

আহিলের কথায়, “আসলে তেমন কিছুই বদলায়নি। আমার বেশির ভাগ বন্ধুই এখনো অনলাইনে আছে।”

তবে তার মা মাউ ছেলের আচরণে কিছু পরিবর্তন লক্ষ করেছেন। তিনি বলেন, “ও এখন আগের চেয়ে বেশি খিটখিটে। ভিডিও গেমও বেশি খেলছে। আগে যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ছিল, তখন অনেক বেশি কথা বলত, বেশি সামাজিক ছিল।”

তবে মাউ মনে করেন, এই পরিবর্তনের পেছনে ছেলের বয়সন্ধিকালও একটি কারণ হতে পারে।

এ বিষয়ে ভোক্তা মনস্তত্ত্ববিদ ক্রিস্টিনা অ্যান্থনি বলেন, হঠাৎ করে পরিচিত একটি অভ্যাস বন্ধ হয়ে গেলে অনেক কিশোর-কিশোরীর মধ্যে বিরক্তি ও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। তার ভাষায়, “অনেকের কাছে সোশ্যাল মিডিয়া শুধু বিনোদন নয়—এটি একঘেয়েমি, মানসিক চাপ আর সামাজিক উদ্বেগ সামলানোর একটি উপায়। সেটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে তারা শূন্যতা অনুভব করে।”

তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই কিশোর-কিশোরীরা আবেগ সামলানোর নতুন পথ খুঁজে নেবে এবং বিশ্বাসযোগ্য বড়দের সঙ্গে কথা বলার দিকে আরও বেশি ঝুঁকবে।

Advertisements