হাতের কারুকাজে সংসারের হাল ধরছেন রংপুরের নারী শোলাশিল্পীরা

শীত মৌসুম শুরু হলেই বিয়ে ও নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ধুম পড়ে যায়। আর এই সময়টাকে ঘিরে রংপুর অঞ্চলের শোলাশিল্পীদের কর্মচাঞ্চল্যও বেড়ে যায় কয়েকগুণ। প্রতিবছরের মতো চলতি শীত মৌসুমেও দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছেন শোলাশিল্পের সঙ্গে যুক্ত কারিগরেরা।
বিয়ে ছাড়াও বিভিন্ন ধর্মীয় আচার, পূজা-পার্বণ ও সামাজিক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শোলার তৈরি সামগ্রীর চাহিদা হঠাৎ করেই বাড়তে থাকে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) সূত্রে জানা যায়, রংপুর অঞ্চলে শোলা শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন পাঁচ শতাধিক পরিবার।
এই শিল্পের কারিগরেরা বিয়ের মুকুট ও অন্নপ্রাশনের সাজ থেকে শুরু করে দেব-দেবীর মূর্তি, ঐতিহ্যবাহী খেলনা ও নানা ধরনের সাজসজ্জার উপকরণ তৈরি করেন। বিয়ে, পূজা ও সামাজিক অনুষ্ঠানের মণ্ডপ সাজানোর কাজেও নিয়মিত ডাক পড়ে তাঁদের।
শোলাশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়টাই শোলার তৈরি পণ্যের জন্য সবচেয়ে ভালো বিক্রির মৌসুম। কারিগর ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শোলার তৈরি একটি মুকুটের দাম সাধারণত ৭০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়।
ছোটবেলাতেই বাবার কাছ থেকে শোলা দিয়ে অলংকার তৈরির কাজ শিখেছেন লালমনিরহাট সদর উপজেলার সাধুটারী গ্রামের বাসিন্দা রামানুজ বর্মণ (৫০)। তিনি তার বাড়িতে একটি কারখানাও চালু করেছেন। সম্প্রতি তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির উঠোনে শোলা কাটা, রং করা এবং জোড়া দেয়ার কাজে শ্রমিকেরা ব্যস্ত সময় পার করছেন।
রামানুজ বর্মণ বলেন, ‘সারা বছরই শোলার কাজ করি তবে শীতকালে ব্যস্ততা বেশি থাকে। পাইকারেরা বিয়ে ও অন্নপ্রাশনের মুকুটের জন্য আগাম বায়না দিয়ে রাখে। প্রতিটি মুকুট আমরা ৪০০-৬০০ টাকায় বিক্রি করি। এতে ২৫০-৩৫০ টাকা পর্যন্ত লাভ থাকে।’ প্রতি বছর ৭-৮ লাখ টাকার শোলার তৈরি নানান সামগ্রী বিক্রি করেন বলে জানান তিনি।
শোলা শিল্পের সঙ্গে সংযুক্ত কারিগরেরা জানান, বিক্রি বাড়লেও কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের আয় কমেছে। পিতৃপুরুষের ঐতিহ্য ধরে রাখতেই অনেকে এখনও এ শিল্পে রয়ে গেছেন।
সাধুটরী গ্রামের বাসিন্দা বাসনা রানী (৪৪) বলেন, ‘বাপ-ঠাকুরদার আমল থেকেই আমরা এ কাজ করে আসছি। হিন্দুদের বিয়ে ও অন্নপ্রাশনে শোলার মুকুট পরা বাধ্যতামূলক। তাই এর চাহিদা কখনোই শেষ হবে না।’ চাহিদা অনুযায়ী শোলা পাওয়া গেলে একজন কারিগর দিনে পাঁচ-ছয়টি মুকুট তৈরি করতে পারে বলে জানান তিনি।
বর্তমানে শোলা পাওয়া বেশ কঠিন বলে মন্তব্য করেন রংপুর শহরের মাহিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা কারিগর সুধীর চন্দ্র সেন (৬৫)। তিনি বলেন, ‘আগে আমাদের কাছাকাছি গ্রামগুলোতে শোলা পাওয়া যেত। কিন্তু এখন দূরদূরান্ত থেকে কিনে আনতে হয়।’
প্রতি বছর ১০ লাখ টাকার শোলার তৈরির সামগ্রী বিক্রি করেন বলে জানান তিনি।
তবে শীতকালে ভালো বিক্রি হলেও মৌসুমি পণ্য হওয়ায় নতুন প্রজন্ম এই কাজে আসতে চায়না বলে জানান সুধীর চন্দ্র। তিনি বলেন, ‘এ কাজে প্রচুর ধৈর্য দরকার। তাই নতুন প্রজন্মের কেউ এ কাজে আসতে চায়না।’
লালমনিরহাট শহরের হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা হীরালাল রায় (৭০) বলেন, ‘শোলার তৈরি সামগ্রী বেশি দামি না হলেও দেখতে ভীষণ সুন্দর। তাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমরা এই মুকুট ও প্রতিমা ব্যবহার করে আসছি। এখনো বিয়ের মঞ্চ ও মণ্ডপ সাজাতে শোলা কারিগরদের ডাক পড়ে। এ ঐতিহ্য ও শিল্প রক্ষার জন্য সরকারের এগিয়ে আসা উচিত।’



