বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
স্পটলাইট

অনিশ্চিত জীবনের গল্পে সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা ‘স্থায়ী চাকরি’

WhatsApp Image 2026-01-05 at 6.39.03 PM

বাংলাদেশ নারী কাবাডির সবচেয়ে অভিজ্ঞ মুখগুলোর একজন শ্রাবণী মল্লিক। সম্প্রতি তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ পুলিশ প্রথমবারের মতো জাতীয় নারী কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতে, যার মাধ্যমে সাবেক চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপির আধিপত্যের অবসান ঘটে।

ম্যাটের ভেতরে শ্রাবণী মল্লিক মানেই দৃঢ়তা, গতি আর আত্মবিশ্বাস। নারী এশিয়ান কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপ ও নারী কাবাডি বিশ্বকাপে ব্রোঞ্জজয়ী বাংলাদেশের দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ এই সদস্য সম্প্রতি জাতীয় নারী কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপে হয়েছেন সেরা খেলোয়াড়। ব্যক্তিগত এই স্বীকৃতি তাঁর কাছে আনন্দের হলেও, তাতে সবচেয়ে বেশি তৃপ্তি এসেছে দলগত সাফল্য থেকে। কারণ তাঁর নতুন দল বাংলাদেশ পুলিশ প্রথমবারের মতো জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।

প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সেই টুর্নামেন্টে পুলিশ, আনসার ও ভিডিপি এবং বিজিবি—সব দলেই ছিলেন জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা। এমন প্রতিযোগিতার ভিড়ে সেরা খেলোয়াড় হওয়া শ্রাবণীর কাবাডি–যাত্রার আরেকটি মাইলফলক।

তবে এই পথটা সহজ ছিল না। ২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি খেলেছেন বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপির হয়ে। ওই সময়ে কাবাডির পাশাপাশি অ্যাথলেটিকস ও রেসলিংয়েও সমান দাপট দেখিয়েছেন। শটপুটে টানা সাতটি স্বর্ণপদক, আর ৭৬ কেজি রেসলিং বিভাগে পাঁচটি স্বর্ণ—পদকের ঝুলিতে সাফল্যের কমতি ছিল না। তবু জীবনের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা ছিল চাকরির নিরাপত্তা।

Advertisements

একাধিকবার স্থায়ী চাকরির জন্য আবেদন করেও তা না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন শ্রাবণী। সেখানে অন্তত আগের চেয়ে কিছুটা ভালো বেতন পাচ্ছেন—এই বাস্তবতাটুকুই এখন তাঁর ভরসা।

একই সঙ্গে তিনটি ডিসিপ্লিনে খেলা চালিয়ে যাওয়া যে আর সহজ নয়, সেটাও জানেন তিনি। কাবাডিতে এখন দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে দায়িত্ব বেড়েছে। সামনে কী হবে, সেটি সময়ই বলবে।

২০১৪ সাল থেকে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা শুরু করা শ্রাবণীর পদকের সংখ্যা গুনে শেষ করা কঠিন। ব্যক্তিগত ও দলগত মিলিয়ে শতাধিক পদক জিতেছেন বলে তাঁর ধারণা, যার বেশির ভাগই স্বর্ণ।

তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে বাস্তববাদী শ্রাবণী। দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের কারণে ব্রোঞ্জ জেতা সম্ভব হলেও ফিটনেস, দক্ষতা ও শারীরিক শক্তিতে এখনও শীর্ষ দলগুলোর চেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে রক্ষণভাগের দুর্বলতা—গোড়ালি ধরতে না পারা কিংবা রেইডে বোনাস পয়েন্ট আদায়ে ব্যর্থতা—এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

এই খেলাটির অবকাঠামোগত ঘাটতির কথাও অকপটে বলেন তিনি। কাবাডি খেলোয়াড়দের জন্য আলাদা জিম না থাকাটা বড় সমস্যা। ফিটনেস যেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে নিয়মিত জিম সুবিধা না থাকা খেলোয়াড়দের উন্নতিতে বড় বাধা। পাশাপাশি আর্থিক নিরাপত্তার অভাবও ভাবিয়ে তোলে তাঁকে। দরিদ্র পরিবার থেকে আসা অনেক খেলোয়াড়ের স্থায়ী চাকরি নেই; নিয়মিত সম্মানী পেলে তারা আরও অনুপ্রাণিত হতো বলে মনে করেন শ্রাবণী।

ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে আশাবাদী হলেও বাস্তবতাও অস্বীকার করেন না তিনি। নারী কাবাডিতে খেলোয়াড়ের সংখ্যা এখনও কম। শরীরঘেঁষা এই খেলায় জুনিয়রদের ফিটনেস গড়ে তুলতে সময় লাগে। তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ আর নিয়মিত আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পেলে একদিন তারাও সিনিয়রদের জায়গা নিতে পারবে—এই বিশ্বাস রাখেন তিনি।

সব সাফল্য, পদক আর স্বীকৃতির মাঝেও একটি আক্ষেপ শ্রাবণীর কণ্ঠে স্পষ্ট। বাবা–মা চেয়েছিলেন পড়াশোনায় মন দিতে, কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছিলেন খেলাধুলা। আজ ২৮ বছর বয়সে এসে, যখন খেলোয়াড়ি জীবনের শেষ অধ্যায় কাছাকাছি, তখন ফিরে ফিরে আসে সেই বাস্তবতা— স্থায়ী চাকরি না থাকাটাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ।

Advertisements