বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের দীর্ঘ বিরতি

একসময় দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হতো নারী নেতৃত্বের ব্যতিক্রমী উদাহরণ হিসেবে। টানা প্রায় ৩৪ বছর রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্র ও বিরোধী রাজনীতির মুখ্য অবস্থানে ছিলেন দুই নারী—বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা। সরকার, বিরোধী দল কিংবা জাতীয় সিদ্ধান্ত—সব ক্ষেত্রেই ছিল তাদের সরব উপস্থিতি। কিন্তু সময়ের প্রবাহে সেই চিত্র বদলে গেছে।
২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশের রাজনীতি দাঁড়িয়েছে এক ভিন্ন বাস্তবতায়—যেখানে ক্ষমতার মঞ্চে কার্যকর কোনো নারী নেতৃত্ব আর দৃশ্যমান নয়।
দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গণঅভ্যুত্থানে পদত্যাগ ও নির্বাসন, আর বিরোধী দলীয় নেত্রী রওশন এরশাদের দীর্ঘ অসুস্থতা—সব মিলিয়ে রাজপথ ও সংসদীয় রাজনীতিতে সক্রিয় নারী নেতৃত্ব প্রায় শূন্য।
দলীয় রাজনীতিতে নারীর অনুপস্থিতি
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোতে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবতায় এর প্রতিফলন নেই বললেই চলে। বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার মৃত্যু নারী নেতৃত্বের সংকটকে আরও প্রকট করেছে।
২০২৬ সালের নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী ৩০০ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করলেও সেখানে একজন নারীও নেই। বিএনপির ঘোষিত প্রার্থী তালিকায় খালেদা জিয়াসহ নারী প্রার্থী মাত্র সাতজন। শরিক দল বাদ দিলে ঘোষিত আসনগুলোর তুলনায় নারী প্রার্থীর হার অত্যন্ত কম।
বিএনপির আলোচিত মুখ ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা দীর্ঘদিন গণমাধ্যম ও সংসদে সরব থাকলেও শেষ পর্যন্ত দলীয় মনোনয়ন পাননি। স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্তের পর দল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে তার রাজনৈতিক যাত্রা কার্যত থমকে যায়।
নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপিও শুরুতে ১২৫ আসনে প্রার্থী দিলেও নারী ছিলেন মাত্র ১৩ জন। পরে জামায়াতের সঙ্গে জোট ঘোষণার পর সেই তালিকাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। জোটের সিদ্ধান্তের পর দল ছাড়েন ডা. তাসনিম জারা ও ডা. তাজনূভা জাবিন। আরেক তরুণ নেত্রী নুসরাত তাবাসসুমও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।
২০২৪ সালের গণআন্দোলনের পর ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেখানে সামনের সারিতে থাকা এই তরুণ নারীদের সরে যাওয়া রাজনীতিতে নারী উপস্থিতির সংকটকে আরও গভীর করেছে।
তিন দশকের নারী নেতৃত্বের ইতিহাস
১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন নারীরা। কখনো ক্ষমতায়, কখনো বিরোধী দলে—খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা ছিলেন রাজনীতির প্রধান দুই মেরু। ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮—প্রতিটি নির্বাচনী অধ্যায়েই এই দুই নেত্রীর উপস্থিতি রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।
কিন্তু ২০২০-এর দশকের মাঝামাঝি এসে সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ মনে করেন, বাংলাদেশের নারী নেতৃত্ব মূলত পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির ফল। তার মতে, ভবিষ্যতে নতুন নারী নেতৃত্ব এলে সেটিও রাজনৈতিক পরিবার থেকেই আসতে পারে।
অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ব্যারিস্টার মিতি সানজানা বলেন, আইনি কাঠামো থাকলেও বাস্তবে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি। সামাজিক চাপ, সাইবার বুলিং ও নিরাপত্তাহীনতা নারীদের রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
তার মতে, দল ছাড়লেও নারীরা যেন রাজনীতির পরিসর থেকে হারিয়ে না যান—সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।



