বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
স্পটলাইট

শিশুর ভুয়া জন্ম–মৃ/ত্যু দেখিয়ে নিবন্ধনের লক্ষ্য পূরণের ভ/য়াবহ কৌশল

IMG-20251226-WA0037

রোমান আহমেদ ও মোসাম্মত মৌসুমি ইসলাম—স্বামী-স্ত্রী হিসেবে যাঁদের নাম সরকারি নথিতে রয়েছে। তাঁদের খোঁজ করতে গিয়ে আমাদের বেশ সময় ব্যয় করতে হয়।

ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, রোমানের বাবা গোলাপ মিয়া ও মা খাদিজা বেগম। স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ আছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সাদেকপুর ইউনিয়নের সাদেকপুর গ্রাম। সরকারি নথিতে আরও বলা হয়েছে, রোমান সম্প্রতি ‘ডায়াবেটিসজনিত কারণে’ মারা গেছেন।

কিন্তু দীর্ঘ সময় খোঁজাখুঁজি করেও সাদেকপুর গ্রামের কোনো বাসিন্দার কাছ থেকে রোমানের পরিবারের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।পরবর্তীতে জানা যায়, রোমানের প্রকৃত বসবাস একই ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামে। সেখানে গিয়ে সহজেই তাঁর পরিবারের সন্ধান মেলে। পাকা বাড়ির দরজায় ডাক দিলে বেরিয়ে আসেন তাঁর মা খাদিজা বেগম। ঘটনাটি ঘটে গত ১১ নভেম্বর।রোমান আহমেদকে খোঁজার পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করার আগে তাঁর সম্পর্কে সরকারি নথিতে থাকা তথ্যে চোখ রাখা জরুরি। ইউপির তথ্য অনুযায়ী, রোমানের বয়স ১৯ বছর এবং তাঁর স্ত্রী মৌসুমির বয়স ১৮। এই দম্পতির সন্তানের সংখ্যা দেখানো হয়েছে ১৯। সর্বশেষ সন্তান সাচ্চু জারিফের জন্ম হয়েছে চলতি বছরের ১০ অক্টোবর। এই তথ্য শুনে যে কেউ বিস্মিত হবেন।

আরও চমকপ্রদ তথ্য হলো—ইউপির নথিতে উল্লেখ আছে, সাচ্চু জারিফ জন্মের ৪০ দিন পর, অর্থাৎ ৯ নভেম্বর মারা গেছে। একই দিনে, অর্থাৎ ১০ অক্টোবর, জন্ম হয়েছে আরও দুই সন্তানের—১৩ নম্বর সন্তান মিতু মনি ও ১৮ নম্বর সন্তান মিলি মনি। মিতু মারা গেছে ৯ নভেম্বর এবং মিলি মারা গেছে ৩০ অক্টোবর।

Advertisements

তিন শিশুর মৃত্যুর কারণ দেখানো হয়েছে ‘কার্ডিওজেনিক শক (হৃদ্‌রোগ)’। আরও অবিশ্বাস্য তথ্য হলো—তিন সন্তানের জন্মের আগের দিন বাবা রোমানের মৃত্যু দেখানো হয়েছে। আবার দুই সন্তানের জন্মের দিন, অর্থাৎ ১০ অক্টোবর, মৃত্যু দেখানো হয়েছে মা মৌসুমির। এমনকি একটি সন্তানের জন্ম দেখানো হয়েছে মায়ের মৃত্যুর পর।

১৮ বছর বয়সী এক নারীর ১৯ সন্তান, আবার মৃত্যুর ২০ দিন পর সন্তানের জন্ম—এই তথ্যগুলো শুনলে যে কারও মাথা ঘুরে যাওয়ার কথা। কিন্তু এসবই বাংলাদেশের সরকারি জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন তথ্যভান্ডারে সংরক্ষিত তথ্য। বাস্তবতা হলো—পুরোটাই ভুয়া।

রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের অধীন জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন ব্যবস্থায় ইউনিয়ন পরিষদগুলো ইচ্ছেমতো শিশুর জন্মনিবন্ধন করছে, এরপর অল্প সময়ের ব্যবধানে সেই শিশুর মৃত্যু নিবন্ধন দেখানো হচ্ছে। এর পেছনে মূল কারণ—ইউনিয়ন পরিষদগুলোর ওপর জন্ম-মৃত্যুনিবন্ধনের নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণের চাপ এবং লক্ষ্য পূরণে স্বীকৃতি পাওয়ার সুযোগ। এই চাপ থেকেই জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে, যার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ ‘রোমান ও মৌসুমি দম্পতির’ ঘটনা।

নিয়ম অনুযায়ী, জন্ম বা মৃত্যুনিবন্ধনের জন্য অনলাইনে আবেদন করার পর আবেদনকারী ইউপি কার্যালয়ে এসে প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা ইউপি সচিবের কাছে কাগজপত্র জমা দেন। ইউপি সচিব সহকারী নিবন্ধক হিসেবে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে দেওয়া আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে সিস্টেমে প্রবেশ করেন। তথ্য যাচাই শেষে আবেদনকারীর দেওয়া ফি অনলাইনে গ্রহণ করা হয়। এরপর চেয়ারম্যান তাঁর আইডি ব্যবহার করে নিবন্ধন অনুমোদন দেন। অনুমোদনের পর ইউপি সচিব জন্ম বা মৃত্যুসনদ প্রিন্ট করে আবেদনকারীকে সরবরাহ করেন।

এই প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে রোমানের জন্মনিবন্ধনের নম্বর ও জন্মতারিখ ব্যবহার করে তাঁর অজান্তেই ইউপি কার্যালয় থেকে একটি কাল্পনিক দম্পতি তৈরি করা হয়েছে। সেই দম্পতির নামে একের পর এক ভুয়া শিশুর জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন করা হয়েছে। শুধু গ্রামের নাম সামান্য পরিবর্তন করা হয়েছে।

১১ নভেম্বর দুপুর দেড়টার দিকে আমরা যখন রোমানের বাড়িতে পৌঁছাই, তখন তাঁর মা খাদিজা বেগম রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। সম্প্রতি গ্রামে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটায় তিনি আতঙ্কে ছিলেন। আমাদের দেখে প্রথমে তিনি ভয় পেয়ে যান—ভাবছিলেন, হয়তো ওই ঘটনার সঙ্গে তাঁদের কোনোভাবে জড়ানো হবে।

পরিচয় দেওয়ার পর কথা বলে জানা যায়, তাঁর স্বামী গোলাপ মিয়া কুমিল্লায় একটি বেকারির ব্যবসা করেন। তাঁদের সংসারে দুই ছেলে ও এক মেয়ে। রোমান দ্বিতীয় সন্তান। বড় ছেলে রুবেল সৌদি আরবে কর্মরত। রোমান ঢাকায় একটি দোকানে কাজ করেন। তাঁদের মেয়ের বিয়ে হয়েছে। তবে দুই ছেলের কেউই বিবাহিত নন।

Advertisements