বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
স্পটলাইট

যুদ্ধের ইতিহাসে তিন গারো নারীর অনন্য ভূমিকা

mlysy_16

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ কেবল সমতলের লড়াই ছিল না; তার দাবানল ছড়িয়ে পড়েছিল পাহাড় ও সীমান্তঘেঁষা জনপদেও। বিশেষ করে ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অবদান ছিল অসামান্য। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আদিবাসীরা অস্ত্র হাতে যেমন লড়েছেন, তেমনি সেবা, ত্যাগ ও মানবিকতার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিয়েছেন।

এই ইতিহাসে গারো সম্প্রদায়ের তিন নারীর ভূমিকা আলাদাভাবে স্মরণযোগ্য। তাঁরা সরাসরি যুদ্ধাস্ত্র বহন করেননি; কিন্তু তাঁদের নিরলস সেবায় মৃত্যুপথযাত্রী অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা ফিরে পেয়েছেন জীবনের আলো।
এই তিন অকুতোভয় নারী হলেন—ভেরেনিকা সিসংমা, সন্ধ্যারানী সাংমা ও তুশি হাগিদক।

তাঁদের হাতে স্টেনগান ছিল না, কিন্তু একটি প্রাণ বাঁচানোর যে যুদ্ধ তাঁরা লড়েছিলেন, তা কোনোভাবেই কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।

ভেরেনিকা সিসংমা

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার জয়রামকুড়া—সবুজে ঘেরা, শান্ত একটি গ্রাম। সেখানেই ভেরেনিকা সিসংমার বেড়ে ওঠা। রেভারেন্ড সুধীর চিসিমের সহধর্মিণী হিসেবে তাঁর জীবন চলছিল নিরুপদ্রবভাবে। কিন্তু ১৯৭১ সালের এপ্রিলে হালুয়াঘাটে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর হামলা সবকিছু বদলে দেয়।

Advertisements

প্রাণ বাঁচাতে হাজারো মানুষের সঙ্গে তিনিও আশ্রয় নেন ভারতের মেঘালয়ে। কিন্তু শরণার্থী জীবনের অনিশ্চয়তা তাঁকে নিষ্ক্রিয় করে রাখতে পারেনি। প্রতিদিন সীমান্ত পেরিয়ে আসা আহত মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তাক্ত শরীর, বিচ্ছিন্ন অঙ্গ কিংবা পচে যাওয়া ক্ষত তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তখনই তিনি স্থির করেন—এই যোদ্ধাদের বাঁচাতে তাঁকেও কিছু করতেই হবে।

ভারতের তুরা সিভিল হাসপাতালে ডা. জেড আই চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে দ্রুত নার্সিং প্রশিক্ষণ নেন ভেরেনিকা। এরপর যোগ দেন বিশুয়িখলা ক্যাম্পে। সেখানে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা মুক্তিযোদ্ধাদের তিনি স্নেহ আর নিষ্ঠায় সেবা করতেন। অনেক সময় ক্ষতস্থানে গ্যাংগ্রিন হয়ে ভয়ংকর দুর্গন্ধ ছড়াত, তবুও তিনি মুখ ফিরিয়ে নিতেন না। নিজের হাতে সেই ক্ষত পরিষ্কার করতেন।

ভেরেনিকা বিশ্বাস করতেন—একটু মমতার স্পর্শও একজন মুক্তিযোদ্ধাকে আবার বাঁচার শক্তি দিতে পারে।

২০১৮ সালের আগস্টে এই মানবতাবাদী নারী পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।

সন্ধ্যারানী সাংমা

কলমাকান্দা উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের নলছাপ্রা গ্রামে বসবাস করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সন্ধ্যা রানী সাংমা (বীর প্রতীক)। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়লেও মানসিকভাবে তিনি এখনো দৃঢ় ও কর্মচঞ্চল। প্রতিদিন ভোরে উঠে রান্না, উঠান ঝাড়ু দেওয়া, সংসারের কাজ নিজ হাতেই করেন। ঘরের শোকেসে সাজানো বিভিন্ন সম্মাননা আর ট্রাঙ্কভর্তি দলিলপত্র তাঁর মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত সাক্ষ্য বহন করে।

১৯৫০ সালে মধুপুরের বোকারবাইট গ্রামে একটি গারো আদিবাসী পরিবারে জন্ম সন্ধ্যা রানী সাংমার। ছোটবেলা থেকেই মানুষের সেবা করার মানসিকতা ছিল তাঁর মধ্যে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা শেষে ১৯৬৯ সালে আত্মীয় ভেরুনিকা সাংমার সঙ্গে হালুয়াঘাটের জয়রামকুড়া খ্রিষ্টিয়ান হাসপাতালে নার্সিং প্রশিক্ষণে ভর্তি হন। দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নকালে শুরু হয় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ।

যুদ্ধকালীন অস্থিরতায় একের পর এক মিশন ও শরণার্থী শিবির ঘুরে তিনি ভারতের মহেন্দ্রগঞ্জে পৌঁছান। ডা. পীযুষ কান্তি রায়ের সহযোগিতায় তিনি যোগ দেন ১১ নম্বর সেক্টর ফিল্ড হাসপাতালে। বাঁশের তৈরি ৪৫ শয্যার হাসপাতালে হারিকেনের আলোয়, কখনো না খেয়ে-না ঘুমিয়ে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করেন তিনি। বক্সিগঞ্জে দায়িত্ব পালনের সময় মর্টারশেল নিক্ষেপের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখিও হতে হয়, তবু তাঁর সেবাকাজ থেমে থাকেনি।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আবু তাহেরের সহযোগিতায় তিনি বাড়ি ফেরেন। দীর্ঘ নয় মাস পর মেয়েকে জীবিত ফিরে পেয়ে তাঁর বাবা-মায়ের আবেগ ছিল ভাষায় প্রকাশের অতীত। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সন্ধ্যা রানী সাংমা বিভিন্ন সময়ে একাধিক সম্মাননা লাভ করেন। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—তিনি ২০০৭ সালে ‘অনন্যা শীর্ষ দশ’ সম্মাননা অর্জন করেন। এছাড়াও নারী মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা, ‘৭১-এর নারী’সহ মোট দশটির বেশি স্বীকৃতি পেয়েছেন।

তুশি হাগিদক

এই তিন নারীর মধ্যে সবচেয়ে কনিষ্ঠ ছিলেন তুশি হাগিদক। স্বভাবে প্রাণচঞ্চল তুশি যুদ্ধের সময় ছিলেন তরুণ বয়সেই। তারুণ্যের সাহস বুকে নিয়ে তিনিও নাম লেখান নার্সিং স্কোয়াডে।

মেঘালয়ের তুরা ও ডালু অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে তিনি ছিলেন নিরলস কর্মী। বড় কোনো অভিযানের পর ট্রাকভর্তি আহত মুক্তিযোদ্ধা এলে সবার আগে ছুটে যেতেন তুশিই। রক্তে ভেজা ব্যান্ডেজ খুলে দেওয়া, ওষুধ খাওয়ানো, আর মানসিকভাবে ভেঙে পড়া যোদ্ধাদের সাহস জোগানো—সব দায়িত্বই তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন।

যুদ্ধ শেষে তিনি ফিরে যান নিজের চেনা পাহাড়ি জীবনে।

Advertisements