২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | শুক্রবারবাংলা: ১০ আশ্বিন ১৪৩৩
নারী

সেতারের সুরে নিজস্ব পৃথিবী গড়ে তুলেছেন আনুশকা শঙ্কর

IMG-20260925-WA0005

সেতারের তারে যখন একের পর এক সুরের ঢেউ ওঠে, তখন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ঐতিহ্য যেন নতুন এক ভাষা খুঁজে পায়। সেই ভাষাকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে যাঁদের নাম আলাদা করে উচ্চারিত হয়, তাঁদের একজন আনুশকা শঙ্কর। কিংবদন্তি সেতারবাদক ও সুরকার রবিশঙ্করের কন্যা হলেও নিজের সংগীত পরিচয় তৈরি করেছেন তিনি নিজস্ব প্রতিভা, পরিশ্রম ও নিরীক্ষার মাধ্যমে।

ছোটবেলা থেকেই সংগীত ছিল তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাবার কাছেই সেতারের প্রাথমিক ও গভীর তালিম নেওয়া শুরু করেন আনুশকা। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি প্রথমবারের মতো পেশাদারভাবে মঞ্চে সেতার পরিবেশন করেন। এরপর ধীরে ধীরে তাঁর সংগীতচর্চা ছড়িয়ে পড়ে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের গণ্ডির বাইরেও।

রবিশঙ্করের উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর ওপর প্রত্যাশা ছিল স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। তবে সেই পরিচয়কে নিজের জন্য বোঝা না বানিয়ে বরং ঐতিহ্যের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নিজের সংগীতভাষা নির্মাণ করেছেন আনুশকা। তাঁর পরিবেশনায় যেমন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের গভীরতা রয়েছে, তেমনি রয়েছে সমকালীন সংগীতের নানা উপাদানের সঙ্গে পরীক্ষার সাহস।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মঞ্চে সেতার হাতে হাজির হয়েছেন তিনি। তাঁর সংগীতে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সঙ্গে জ্যাজ, ইলেকট্রনিক, অ্যাম্বিয়েন্ট ও অন্যান্য সমকালীন ঘরানার মেলবন্ধন শোনা যায়। ফলে তাঁর কাজ একদিকে যেমন শাস্ত্রীয় সংগীতপ্রেমীদের আকর্ষণ করে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছেও ভারতীয় সেতারের সুরকে পরিচিত করে তোলে।

আনুশকার সংগীতজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর সহযোগিতামূলক কাজ। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পী ও সংগীতশিল্পীদের সঙ্গে কাজ করে তিনি দেখিয়েছেন—সংগীতের ভাষা কোনো নির্দিষ্ট সীমান্তে আটকে থাকে না। ভিন্ন সংস্কৃতি ও ঘরানার শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর যৌথ পরিবেশনা ভারতীয় সংগীতের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাকেও নতুন মাত্রা দিয়েছে।

Advertisements

তাঁর সাফল্যের স্বীকৃতিও এসেছে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে। একাধিকবার গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হয়েছেন আনুশকা শঙ্কর। পুরস্কারের স্বীকৃতির পাশাপাশি তাঁর দীর্ঘ সংগীতযাত্রার সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত এটিই—তিনি সেতারকে কেবল একটি ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করেননি; বরং এর সম্ভাবনাকে সমকালীন বিশ্বের সামনে নতুন করে তুলে ধরেছেন। তবে আনুশকার পথচলা শুধুই মঞ্চ, অ্যালবাম কিংবা পুরস্কারের গল্প নয়। নিজের শিল্পীসত্তা নিয়ে তিনি বরাবরই সচেতন। বাবার বিশাল উত্তরাধিকার তাঁর সামনে একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছিল, কিন্তু সেই ভিত্তির ওপর নিজের আলাদা একটি ঘর তৈরি করাই ছিল তাঁর বড় চ্যালেঞ্জ। সময়ের সঙ্গে তিনি প্রমাণ করেছেন, ‘রবিশঙ্করের কন্যা’ পরিচয়ের বাইরেও তাঁর নিজস্ব একটি শক্তিশালী সংগীতপরিচয় রয়েছে।

আজ আনুশকা শঙ্করের নাম উচ্চারিত হলে শুধু একজন সেতারবাদকের ছবি ভেসে ওঠে না; বরং এমন একজন শিল্পীর কথা মনে পড়ে, যিনি ঐতিহ্যকে সম্মান করেও পরিবর্তনকে গ্রহণ করেছেন। তাঁর হাতে সেতারের পুরোনো তারে নতুন সুর জন্ম নেয়, আর সেই সুর পেরিয়ে যায় ভাষা, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক সীমারেখা।

রবিশঙ্করের উত্তরাধিকার বহন করলেও আনুশকার সংগীত যেন তাঁর নিজেরই নির্মিত এক পৃথিবী—যেখানে শিকড় রয়েছে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে, আর দৃষ্টি নিবদ্ধ বিশ্বসংগীতের বিস্তৃত আকাশে।

Advertisements