বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
স্পটলাইট

বিয়ের পর অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণে নারীর হার ৪৭ শতাংশ

15-SM713803

দেশে বিয়ের পর পরিকল্পিত সময়ের আগেই ৪৭ নারী গর্ভধারণ করছেন। গ্রামের তুলনায় শহরের বস্তিতে গর্ভধারণের এই হার তিন গুণের বেশি। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে।

আজ বুধবার আইসিডিডিআরবির সাসাকাওয়া মিলনায়তনে এই গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়েছে। বিজ্ঞানী ফৌজিয়া আখতার হুদা, সহকারী বিজ্ঞানী তারানা-ই-ফেরদৌস ও রিসার্চ ইনভেস্টিগেটর সৈয়দ হাসান ইমতিয়াজ এই দলে ছিলেন। তাঁরাই অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন।

গবেষণার পরিসর ও ফলাফল

‘বাংলাদেশের নির্বাচিত গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলে নববিবাহিত দম্পতিদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার–সংক্রান্ত প্রেক্ষাপট ও চাহিদা নিরূপণ’ শীর্ষক এই গবেষণা দুই বছর ধরে করা হয়েছে। এতে অর্থায়ন করেছে ‘গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা’।

Advertisements

গবেষণাটি বাংলাদেশে এ ধরনের প্রথম দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, যেখানে গ্রাম ও শহরের বস্তি এলাকার নবদম্পতিদের বিয়ের পরবর্তী জীবন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই গবেষণাটি করা হয়। জন্ম-মৃত্যুর সঠিক তথ্য রাখার কার্যকর ব্যবস্থা নেই এমন চারটি এলাকার ৬৬৬ নবদম্পতির মধ্যে মিশ্র পদ্ধতিতে এই গবেষণাটি করা হয়েছে। এলাকাগুলো হলো—কক্সবাজার জেলার চকরিয়া ও চাঁদপুর জেলার মতলব উপজেলার দম্পতিরা। এ ছাড়া শহরের বস্তিগুলোর মধ্যে ঢাকার মিরপুর ও কড়াইল বস্তির নবদম্পতিরা এই গবেষণায় অংশ নেন।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, শহরের বস্তির ৬৮ শতাংশ নারী বিয়ের পর অন্তত দুই বছর অপেক্ষা করতে চাইলেও, ৬৭ শতাংশ নারী ওই সময়ের মধ্যেই গর্ভবতী হয়ে পড়েন। গর্ভনিরোধক ব্যবহারের ক্ষেত্রে শুরুতে শহরের বস্তিতে ব্যবহার বেশি, গ্রামে কম ছিল। তবে বিয়ের প্রায় ১৮ মাস পর উভয় এলাকায় ব্যবহার প্রায় একই পর্যায়ে চলে আসে, যা মূলত নবদম্পতিদের মধ্যে দ্রুত সন্তান নেওয়ার প্রবণতাকে নির্দেশ করে।

গবেষণায়, বিয়ের পরের পরিবর্তন, সন্তান নেওয়ার ইচ্ছা, দাম্পত্য সহিংসতা এবং বৈবাহিক জীবনে মানিয়ে নেওয়ার বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা হয়। দুই বছরে ছয়টি ধাপে এই বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

বাল্যবিবাহ ও শিক্ষায় প্রভাব

গবেষণায় দেখা গেছে, অল্প বয়সে বিয়ের প্রবণতা বেশি। নারীদের মধ্যে গ্রামে ৪৩ শতাংশ এবং শহরের বস্তিতে ৬৫ শতাংশ নারী ১৮ বছরের আগেই বিয়ে করেছেন। পুরুষদের মধ্যে গ্রামে ১৫ শতাংশ এবং শহরে ৩৭ শতাংশ পুরুষ ২১ বছরের আগেই বিয়ে করেছেন। কম বয়সে বিয়ে করা নারীদের অধিকাংশেরই বিয়ে পারিবারিকভাবে ঠিক করা হয়েছিল। এই হার গ্রামে ৮৫ শতাংশ এবং শহরে ৫৩ শতাংশ।

বিয়ের পরপর অধিকাংশ নারী পড়াশোনা বন্ধ করে দেয় উল্লেখ করে গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, বিয়ের পরপরই গ্রামে ৬০ শতাংশ এবং শহরের বস্তিতে ৬৬ শতাংশ নারী পড়াশোনা বন্ধ করেছেন। এর পেছনে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির আপত্তি, মা–বাবার সিদ্ধান্ত, বিয়ের পর বাসস্থান পরিবর্তন, সামাজিক রীতি এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতা কাজ করেছে। আয়মূলক কাজের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বাধা দেখা গেছে, যেখানে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির নিয়ন্ত্রণ নারীদের কাজের সুযোগকে প্রভাবিত করেছে।

দাম্পত্য সহিংসতা ও সন্তুষ্টির মাত্রা

গবেষণায় দেখা গেছে, বিয়ের প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই প্রতি পাঁচজনে চারজন (৭৮ শতাংশ) নারী স্বামীর দ্বারা নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন। দুই বছরের মধ্যে ৫২ শতাংশ আর্থিক, ২৩ শতাংশ মানসিক, ১৫ শতাংশ শারীরিক এবং ১৪ শতাংশ নারী যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। তবে মাত্র ৪ শতাংশ নারী এই সময়ে কোনো ধরনের সহিংসতার শিকার হননি।

দাম্পত্য সন্তুষ্টির মাত্রার চিত্র তুলে ধরে গবেষণায় দেখানো হয়েছে, সময়ের সঙ্গে দাম্পত্য সন্তষ্টির মাত্রা বদলেছে। গবেষণার শুরুতে পুরুষরা নারীদের তুলনায় বেশি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। সময়ের সঙ্গে উভয়ের সন্তুষ্টি কমেছে এবং একপর্যায়ে স্থিতিশীল হয়েছে। তবে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই পতন তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।

ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন এই গবেষণা প্রকল্প অ্যাডসার্চের সমন্বয়কারী ও সহযোগী বিজ্ঞানী আনিসুদ্দিন আহমেদ। এ ছাড়া অ্যাডসার্চের প্রকল্প পরিচালক ও সিনিয়র সায়েন্টিস্ট (এমেরিটাস) শামস এল আরেফিন ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। অনুষ্ঠানে কানাডিয়ান হাইকমিশন বাংলাদেশের স্বাস্থ্য উন্নয়নবিষয়ক ফার্স্ট সেক্রেটারি এডওয়ার্ড কেব্রেইরা গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

ফলাফল উপস্থাপনের পরে আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী আহমেদ এহসানূর রহমানের সঞ্চালনায় একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর (সিসিএসডিপি) মো. রফিকুল ইসলাম তালুকদার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক শাহ আলী আকবর, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের সংগঠনের (ওজিএসবি) সাবেক সভাপতি ফারহানা দেওয়ান, ইউএনএফপিএর বাংলাদেশ প্রতিনিধি রোকসানা ইয়াসমিন আলোচনায় অংশ নেন। সেখানে বিয়ের পরের পরিবর্তন, সন্তান নেওয়ার ইচ্ছা, দাম্পত্য সহিংসতা এবং বৈবাহিক জীবনে মানিয়ে নেওয়ার বিষয়ে কীভাবে কাজ করা যেতে পারে তা নিয়ে আলোচনা হয়।

Advertisements