বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
নারী

অসংখ্য ‘না’ পেরিয়ে মিতার একটিমাত্র ‘হ্যাঁ’

IMG-20251214-WA0047

মিতা তখনো শিশুই। হঠাৎ একদিন জানতে পারল, তার বাবা মাহাবুল ইসলাম নিখোঁজ। ঘরে নেমে এল আতঙ্ক—কেউ ঠিকমতো খেতেও পারছে না, ঘুমাতেও না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর জানা গেল, তিনি ঢাকায় আছেন। জীবিকার খোঁজে রিকশা চালাচ্ছেন। পরে খবর পাঠিয়ে জানালেন, হুট করেই চলে এসেছিলেন—কোথায় থাকবেন, কী করবেন, কিছুই জানা ছিল না। প্রথম দিকে কাপড়ের ব্যাগটাকেই বালিশ বানিয়ে কখনো ফুটপাতে, কখনো রিকশার গ্যারেজে রাত কাটিয়েছেন। পরে ধীরে ধীরে রিকশা চালানোর সুযোগ জোটে।

মিতা যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে, তখন বাবা হঠাৎ করেই ঢাকাজীবন ছেড়ে গ্রামে ফিরে এলেন। রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চকনারায়ণপুর গ্রামে তাঁদের বাড়ি। গ্রামের বাজারে ছোট একটি চায়ের দোকান দেন তিনি—সঙ্গে বিস্কুট আর কলা। সেই দোকানই এখন পরিবারের একমাত্র আয়ের ভরসা। কিন্তু তাতে সংসার চালানো অসম্ভব। তাই এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়েছে বাবাকে। মাস শেষে কিস্তির চাপ যেন আরেকটি সংসার।

না–পাওয়ার ভেতর দিয়ে বড় হওয়া

পড়াশোনায় মিতা বরাবরই ভালো। কিন্তু প্রতিটি শ্রেণিতে প্রয়োজনীয় সহায়ক বই একসঙ্গে কেনা কখনো সম্ভব হয়নি। ধীরে ধীরে, সুযোগ হলে একটি করে বই কিনতেন। এতে পরীক্ষার ফলও সব সময় আশানুরূপ হতো না। নবম শ্রেণিতে ওঠার পর শিক্ষকরা তাঁর আর্থিক সংকট বুঝতে পারেন। তখন থেকে দুই বছর তাঁরা নিজেদের সৌজন্য কপিগুলো দিয়ে সাহায্য করেন। বই নিয়ে আর সমস্যা হয়নি।

কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে তখনই। মিতা তখন স্কুলের ফার্স্ট গার্ল। সবাই জানে, সে বিজ্ঞান বিভাগে পড়বে। কিন্তু বাড়িতে ফিরে বাবার মুখে শোনে কঠিন সত্য—বিজ্ঞানে পড়ার খরচ তাঁদের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। শিক্ষক-শিক্ষিকারাও ভেঙে পড়েন। বিজ্ঞান শিক্ষক সাজিদুল ইসলাম তিন দিন ধরে মিতাকে মানবিক বিভাগের বই নিতে দেননি। তবু শেষ পর্যন্ত মানবিক বিভাগেই ভর্তি হতে হয়।২০১৭ সালে বাঘার রহমতুল্লাহ বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগে জিপিএ–৫ পেয়ে এসএসসি পাস করে মিতা। নম্বর ১১৯৪—উপজেলার মধ্যে সর্বোচ্চ। আর্থিক কারণে দেশের নামকরা কলেজে পড়ার সুযোগ থাকলেও ভর্তি হতে হয় স্থানীয় মোজাহার হোসেন মহিলা ডিগ্রি কলেজে। ২০১৯ সালে সেখান থেকেই এইচএসসিতে আবার জিপিএ–৫ (১১৪১ নম্বর), আবারও উপজেলার সেরা ফল।

স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার লড়াই

Advertisements

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াটাও সহজ ছিল না। মিতার মা সেলিনা বেগম মেয়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন জানতেন। তাই এসএসসির স্কলারশিপের ১৬ হাজার টাকা দিয়ে দুটি ছাগল কিনে রেখেছিলেন।

মিতা বলেন, ‘আমি জীবনে অনেক ‘‘না’’ শুনেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সময় আর একটা ‘‘না’’ শুনতে না হয়—মা সেই প্রস্তুতিটাই নিয়েছিলেন।’

এইচএসসির ফলের পর বাবা চেয়েছিলেন রাজশাহীতেই মেয়েকে ভর্তি করাতে। কিন্তু শিক্ষকদের অনুরোধ আর চাপাচাপিতে শেষ পর্যন্ত ঢাকাতেই পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। শিক্ষকরা চাঁদা তুলে ভর্তি–সংক্রান্ত খরচ জোগাড় করেন। তখনকার ইউএনও শাহীন রেজাও সহযোগিতা করেন—সবকিছু মিতাকে না জানিয়েই।

টিউশনি আর টিকে থাকার গল্প

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন মিতা। শামসুন্নাহার হলে থাকেন। ভর্তি হওয়ার পরপরই করোনা। ক্যাম্পাস বন্ধ, মিতা ফিরে যান গ্রামে। তখন বাঘাতেই টিউশনি শুরু করেন। ছোটবেলা থেকেই পড়াতেন—করোনার পুরো সময়টাই এই আয় ছিল তাঁর ভরসা।

বিশ্ববিদ্যালয় খুললে ঢাকায় টিউশন খুঁজে নতুন লড়াই শুরু হয়। সমাজবিজ্ঞান পড়েন শুনে অনেকেই আগ্রহ দেখায় না। বহু চেষ্টার পর ক্যাম্পাস থেকে অনেক দূরে একটি টিউশনি পান। বেতন ৪ হাজার টাকা। প্রথম মাসের অর্ধেক দিতে হবে মাধ্যমকে—আর কয়েক দিন পড়িয়ে পছন্দ না হলে বাদ। ঝুঁকি নিয়েই রাজি হন। এক মাস পর শিক্ষার্থী খুশি। শুধু তাই নয়, ওই পরিবারের সব টিউশনই মিতার হাতে আসে। একসময় চারটি টিউশনি করে বাবার সংসার চালানো ও ঋণের কিস্তি—দুটোতেই সহযোগিতা করেছেন তিনি।

মিতা বলেন, ‘কখনো আমি কিস্তি দিয়েছি, বাবা সংসার চালিয়েছেন। কখনো আমি সংসার টেনেছি, বাবা কিস্তি দিয়েছেন। এই সমঝোতার মধ্য দিয়েই আমার পড়াশোনা শেষের পথে।’

শাড়ির গল্প, সম্মানের গল্প

৪৯তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষার আগে বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবালের সঙ্গে কথা বলতে যান মিতা। জীবনের গল্প শুনে তিনি হঠাৎ জিজ্ঞেস করেন, ‘ভাইভায় শাড়ি পরবে তো?’

মিতা বলেন, বান্ধবীরা ব্যবস্থা করবে। সেদিন রাত ১১টায় ম্যাম তাঁর স্টাফ দিয়ে একটি সুন্দর শাড়ি পাঠিয়ে দেন। সেই শাড়ি পরেই ভাইভা দেন মিতা।

১১ নভেম্বর প্রকাশিত হয় ৪৯তম বিসিএস (বিশেষ)–এর চূড়ান্ত ফল। সমাজবিজ্ঞানে মাত্র ১৫টি আসনের একটি পেয়েছেন মিতা। অসংখ্য ‘‘না’’ পেরিয়ে সেদিন তিনি পেয়েছেন জীবনের সবচেয়ে বড় ‘‘হ্যাঁ’’।

প্রথম ফোনটি করেছিলেন মাকে—‘মা, তোমার মেয়ে ক্যাডার হয়েছে।’মা শুধু কেঁদেছেন। বাবা পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, আর কান্না নয়। কিন্তু সেদিন তিনজনই কাঁদছিলেন—আনন্দে, স্বস্তিতে, দীর্ঘ লড়াইয়ের শেষে।

মিতার ছোট ভাই মাঈম ইসলাম নবম শ্রেণিতে পড়ে, সেও ক্লাসে প্রথম। তার পড়াশোনার খরচও বহন করেন মিতা। ভবিষ্যতে তিনি মানুষের জন্য কাজ করতে চান, মা–বাবাকে দিতে চান নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবন।

Advertisements