চেনা নেপালের অজানা জগৎ

হিমালয়ের দেশ নেপাল মানেই চোখে ভাসে বরফঢাকা পাহাড়, প্রাচীন মন্দির আর রঙিন সংস্কৃতির ছবি। প্রতিবছর লাখো পর্যটক ভিড় জমান এসব পরিচিত গন্তব্যে। কিন্তু এই ভিড়ের বাইরে একটু সরে গেলেই দেখা মেলে এক ভিন্ন নেপালের। নীরব, সহজ, অথচ গভীরভাবে মুগ্ধ করার মতো এক জগৎ।
নেপালের দক্ষিণ প্রান্তে বিস্তৃত তরাই অঞ্চল ঠিক তেমনই এক অদেখা সৌন্দর্যের নাম। সবুজ তৃণভূমি, জলাভূমি আর অরণ্যে ঘেরা এই নিম্নভূমিতে প্রকৃতি এখনো নিজের মতো করে বেঁচে আছে। এখানেই বাস থারু জনগোষ্ঠীর। যাদের জীবনযাপন, উৎসব আর আতিথেয়তায় মিশে আছে প্রাচীন ঐতিহ্য। তাদের একটি বিশ্বাস খুবই সুন্দর ‘অতিথি দেব ভবঃ’ অর্থাৎ অতিথি মানেই দেবতা।
ধান্য উৎসব ও থারু আতিথেয়তা
নেপাল-ভারত সীমান্ত ঘেঁষা তরাই অঞ্চলের ছোট্ট গ্রাম ভাদা। ধান কাটা শেষ হলে এখানে উদ্যাপিত হয় ‘আউলি’ নামের উৎসব। প্রকৃতির কাছে কৃতজ্ঞতা জানানোর এই উৎসবে গ্রামজুড়ে খুশির আমেজ। স্থানীয় রন্ধনশৈলীতে তৈরি হয় নানা রকম খাবার। পেঁয়াজ, মরিচ, কামরাঙা, চিনি, ধনে ও জিরা দিয়ে বানানো ঝাল-মিষ্টি আচারের স্বাদ অনন্য।
এই উৎসবের একটি ব্যতিক্রমী রীতি হলো ধানখেতের ইঁদুর রান্না করে ভোজ হিসেবে গ্রহণ করা। বিশ্বাস করা হয় এতে দেবতা সন্তুষ্ট হন এবং পরের বছর ফসল রক্ষা পায়। সঙ্গে পরিবেশন করা হয় ‘ছ্যাঙ’ চাল বা বাটারগাছের শুকনো ফুল থেকে তৈরি মিষ্টি ধরনের স্থানীয় পানীয়।ভাদার হোমস্টেগুলো পরিচালনা করেন গ্রামের নারীরা। এতে তারা পেয়েছেন আর্থিক স্বাধীনতা ও সামাজিক মর্যাদা। একটি ছোট উদ্যোগ কীভাবে জীবন বদলে দিতে পারে তার জীবন্ত উদাহরণ এটি।
বন্য প্রাণীর স্বর্গ: তরাইয়ের জাতীয় উদ্যান
তরাই শুধু সংস্কৃতির জন্যই নয়। বন্য প্রাণীর জন্যও অসাধারণ এক অঞ্চল। এখানকার তৃণভূমি আর বন সংরক্ষিত আছে বেশ কয়েকটি জাতীয় উদ্যানের মাধ্যমে। শুক্লা ফান্টা পার্কে দেখা যায় হাজার হাজার চিত্রল হরিণ। এটি বিশ্বের বৃহত্তম বারাশিঙ্গার আবাসস্থল। বারদিয়া ন্যাশনাল পার্ক বিখ্যাত বেঙ্গল টাইগারের জন্য। আর ইউনেসকো ঘোষিত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্কে বেড়ে চলেছে বাঘ, এশীয় হাতি ও এক-শৃঙ্গ গন্ডারের সংখ্যা।
কম ভিড়ে সাফারি ও গন্ডার দর্শন
চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্ক বেশ পরিচিত হলেও এর আশপাশের কমিউনিটি পরিচালিত বনাঞ্চল এখনো অনেকটাই শান্ত। এমনই এক জায়গা বারাউলি গ্রাম। এখানে চারটি কমিউনিটি ফরেস্টের প্রবেশপথ এবং ১২টি হোমস্টে রয়েছে। পর্যটকদের ন্যায্যভাবে হোস্ট পরিবারের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয় যাতে সবাই সমান সুযোগ পান।
হোমস্টে আয়ের একটি বড় অংশ যায় পরিবারগুলোর কাছে। বাকি অর্থ জমা পড়ে কমিউনিটি ফান্ডে। সেই টাকায় স্থানীয় স্কুলে ইংরেজি শিক্ষক নিয়োগের মতো উন্নয়নমূলক কাজও হচ্ছে। স্থানীয় গাইডের সঙ্গে সাফারিতে নারায়ণী নদী পার হয়ে বনভূমিতে ঢুকলে দেখা মিলতে পারে বন্য শূকর, বারাশিঙ্গা, ময়ূর, হর্নবিল পাখি। আর ভাগ্য ভালো হলে এক-শৃঙ্গ গন্ডারের মুখোমুখিও হওয়া যায়।
পরিবেশের প্রতি বদলে যাওয়া দৃষ্টিভঙ্গি
কমিউনিটি ট্যুরিজম তরাই অঞ্চলের মানুষদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। একসময় যে বন্য প্রাণীদের ফসলের শত্রু মনে করা হতো। এখন তারাই হয়ে উঠেছে মূল্যবান সম্পদ। মানুষ বুঝতে পেরেছে প্রকৃতি রক্ষা করলে প্রকৃতিই তাদের রক্ষা করবে।শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে ভ্রমণ করলে উপকৃত হয় পর্যটক, স্থানীয় মানুষ এবং পরিবেশ তিন পক্ষই। নেপালের তরাই অঞ্চল তাই শুধু একটি ভ্রমণ গন্তব্য নয় বরং টেকসই পর্যটনের এক অনুকরণীয় উদাহরণ।



