বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬
ফ্যাশন

লালের অমোঘ আকর্ষণ

15a88d7a61dec44146a193f2789ec121

২০ মিলিয়নেরও বেশি রঙে ভরা পৃথিবীতে এক রঙের প্রভাব বরাবরই অন্যদের ছাপিয়ে গেছে তা হলো লাল। যেন রঙের মুকুটহীন শাসক। শত বছর ধরে দক্ষিণ এশিয়ার বিয়ের আয়োজন লালকে কেন্দ্র করেই গল্প লিখে এসেছে। নানান প্যাস্টেল, সাদা-কালো, আইভরি সবই এসেছে আর গেছে তাদের নিজস্ব সময়ে। তবু লালের প্রভাব কখনোই ম্লান হয়নি। অন্য রঙ যতই উজ্জ্বল হোক, লালকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি। লালকে বলা হয়েছে দ্য আলটিমেট ব্রাইডাল কালার।

স্প্রিংফিল্ড কান্ট্রি ক্লাবের ওয়েডিং ট্রেন্ড রিপোর্ট বলছে, ২০২৫ সালে ব্রাইডাল ফ্যাশনে উজ্জ্বল লাল একটি শক্তিশালী স্টেটমেন্ট হতে যাচ্ছে।

“বউ” শব্দটি মাথায় আসতেই যে ছবি ভেসে ওঠে টুকটুকে লাল ওড়নায় ঢাকা লাজুক মুখ। যদিও বর্তমানে কনে হিসেবে লাল পরা বাধ্যতামূলক নয়, তবে ভারতীয় উপমহাদেশে লালের ইতিহাস এত গভীর যে এটি আমাদের সংস্কৃতির নীরব অংশ হয়ে গেছে। ধর্ম ও আচার ভেদে সামান্য পরিবর্তন থাকলেও লালের গুরুত্ব প্রায় একই। বিবাহের কোনো না কোনো পর্যায়ে লাল শাড়ি, লালের শেড, কিংবা লাল-সোনালি অলংকরণ কোনো না কোনোভাবে কনের সাজে জায়গা নিয়েছে।

বৈদিক যুগে লালের অর্থ ছিল উর্বরতা, প্রেম আর প্রাচুর্য। সেই সময় সিঁদুরের লাল, লাল সুতোর কাপড় আর ওড়না কনেদের সাজে বিশেষ গুরুত্ব পেত। পরে গুপ্ত আমলে লালকে ধরা হত উন্নতি ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে। তখনই মানুষের জীবনে আসে রেশম, আর বিয়ের পোশাকে লালের উপস্থিতি আরও দৃঢ় হয়।

Advertisements

মোগল যুগে এসে লাল একেবারে রাজকীয় মর্যাদা পায় মখমল, রেশমের ঘন লাল জমিনে সোনালি কারুকাজ, যে আভিজাত্যের শুরু করেন মোগল রাজপরিবারই। সে সময় শাড়ি-বুনন, বিশেষ করে তাঁতের জগতেও নতুন মাত্রা যোগ হয়। শীতলক্ষ্যার তীরে জন্ম নেয় জামদানি পল্লি, আর বেনারসের লাল সিল্ক হয়ে ওঠে বিয়ের অপরিহার্য অংশ।

উপনিবেশিক সময়ে লাল আবার নতুন অর্থ পায়। ১৯০৫ সালের স্বদেশি আন্দোলনে দেশপ্রেম, আত্মমর্যাদা আর মাতৃত্বের প্রতীক হিসেবে লাল পাড় সাদা শাড়ি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সেই সময়ের দেশীয় তাঁতের শাড়িই নারীর জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।

দেশভাগের পরও লালের মাহাত্ম্য বদলায়নি। একদিকে লাল জমিনের সিল্ক, অন্যদিকে সাদা গরদ বা জামদানির রক্তলাল পাড় সবই বাঙালি নারীর জীবনে লালকে গভীরতর করেছে।

লাল মানুষের আবেগকে তীব্র করে এটি বিজ্ঞানসম্মত সত্য। মনোবিজ্ঞানে লালকে বলা হয় উচ্চ উত্তেজনার রং। এটি হৃদস্পন্দন বাড়ায়, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে, মনকে করে উদ্দীপ্ত। মনোবিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু এলিয়টের গবেষণা বলছে, লাল পরা মানুষকে অন্যরা বেশি আকর্ষণীয়, প্রাণবন্ত ও আত্মবিশ্বাসী হিসেবে দেখে।

তাই কনে যখন লাল বেছে নেন, সেটি শুধু ঐতিহ্য নয় এটি তাঁর শক্তি, ভালোবাসা, প্রত্যয় এবং নতুন জীবনে পা রাখার সাহসের এক নিঃশব্দ ঘোষণা। লাল কনেকে করে তোলে অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু এ রঙ তারুণ্য, সৃষ্টি, আধ্যাত্মিক শক্তি ও আশীর্বাদের একত্র প্রকাশ।

রুপালি পর্দা দক্ষিণ এশিয়ার বিয়ের ফ্যাশনে গভীর প্রভাব রেখেছে। ১৯৬০ সালের আংশিক রঙিন ছবি মুঘল-ই-আজম–এ লাল-সোনালি বিয়ের পোশাক দর্শকদের তাক লাগিয়ে দেয়। পরবর্তী দশকগুলোতে হেমা মালিনী থেকে শ্রীদেবী, বাংলা চলচ্চিত্রের নায়িকাদের রিচ রেড সিল্ক নারীদের স্বপ্ন হয়ে ওঠে।

২০০৩-এর চোখের বালিতে ঐশ্বরিয়া রায়ের লাল শাড়ি আবার সেই ঐতিহ্যকে নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।

সিনেমায় লাল মানেই প্রেম, উদযাপন, তারুণ্য এই বোধ দর্শকদের মধ্যে প্রজন্ম পর প্রজন্ম ধরে রয়েছে। বলিউড, টলিউড, ঢালিউড সব ক্ষেত্রেই ব্রাইডাল লুক বলতে প্রথম পছন্দ লাল।

প্রাচীন বুননশিল্প থেকে শুরু করে আধুনিক ডিজাইন লাল সবখানেই শীর্ষে। আজকের ডিজাইনাররা ঐতিহ্যের টেক্সটাইলকে যুক্ত করছেন আধুনিক কাট, থ্রেডওয়ার্ক, সিকুয়েন্স ও এমব্রয়ডারির সঙ্গে। ফলে শাড়ির পাশাপাশি লেহেঙ্গা, শারারা, ব্রাইডাল স্যুট সব ক্ষেত্রেই লালের অভিনব উপস্থিতি দেখা যায়।

লালের বিভিন্ন টোন ওম্ব্রে রেড, বার্নিশড মেরুন, ব্রিক রেড আধুনিক কনেদের জন্য হয়ে উঠছে বিশেষ আকর্ষণ। প্রতিটি পোশাক যেন একেকটি ভিজ্যুয়াল ন্যারেটিভ ইতিহাস, শৈলী ও ব্যক্তিগত আত্মপরিচয়ের মিশেল।

সোনালি গয়নার সঙ্গে লালের মেলবন্ধন উপমহাদেশে দীর্ঘকাল ধরে জনপ্রিয়। মেকআপেও লাল টোন অপরিহার্য ডিপ রেড লিপস্টিক, মেরুন টোন, র‌্যাডিশ-ব্রাউন আইশ্যাডো, রেড ব্লাশ। আলতা, নেইলপলিশ সবখানে লালের অপরিহার্যতা।

হিন্দু বিবাহে লাল সিঁদুরের প্রয়োজনীয়তা তো রয়েছেই প্রকৃতিতেও লালের উপস্থিতি বিস্ময়করভাবে প্রবল লোহা-অক্সাইড সমৃদ্ধ মাটি, সিনবার, রুবিয়া উদ্ভিদ, কোকিনিয়াল, ল্যাকপোকার রেজিন—সবই ছিল প্রাচীন রঞ্জনশিল্পের অংশ। মান্দার ফুল ও কুসুম ফুল থেকে সংগৃহীত রঞ্জকও উত্তর ভারতে যজ্ঞ ও টেক্সটাইল রঙে ব্যবহৃত হতো।

ফ্যাশনে প্যানটোন জরুরি কারণ এটি সারা পৃথিবীতে রঙকে একীভূতভাবে বুঝতে সাহায্য করে। নিউইয়র্কে যে লাল ডিজাইনার দেখছেন, প্যারিস বা ঢাকাতেও তা একই শেড হিসেবে স্বীকৃত।

বাংলাদেশ থেকে ভারত, পাকিস্তান থেকে নেপাল—দক্ষিণ এশিয়ার ব্রাইডাল ফ্যাশনে লাল এখনো মেইন চরিত্র। সোনালি জরি, সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারি, লাল জামদানি বা কাতান—সবই কনের সাজকে দেয় রাজকীয় আবেদন। এই রঙ ফটোফ্রেমে যে শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল ইমপ্যাক্ট তৈরি করে, তা অন্য কোনো রঙ সহজে পারে না।

রং যেমনি হোক না কেন জীবনের এই বিশেষ দিনে, শুভ মুহূর্তে প্রত্যেকটা কাজ যেন স্মৃতিময় ও মাধুর্যতা দিয়ে ভরা থাকে সাথে নতুন জীবনের অবিরাম ভালোবাসায় ঘিরে থাকে। 

Advertisements