সন্তানের সামনে রেগে যাচ্ছেন?

সন্তান কথা শুনছে না, খেতে বললে খাচ্ছে না, পড়তে বসতে বললে নানা অজুহাত। এ অভিজ্ঞতা প্রায় সব বাবা–মায়েরই আছে। দিনের পর দিন এমন পরিস্থিতিতে পড়তে পড়তে অনেক সময় অজান্তেই রেগে যাই আমরা। রাগ আসা স্বাভাবিক আবার শিশুদের অবাধ্যতাও বয়সভিত্তিক স্বাভাবিক আচরণ। কিন্তু সেই রাগ যদি অনিয়ন্ত্রিতভাবে সন্তানের সামনে প্রকাশ পায়। তাহলে তা তাদের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
চাপ, ক্লান্তি আর দায়িত্বের ভারে বাবা–মায়ের ধৈর্য কমে যেতেই পারে। তবু রাগ কীভাবে সামলাচ্ছেন, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আপনার আচরণই সন্তানের শেখার সবচেয়ে বড় মাধ্যম।
রাগ উঠে গেলে তখন কী করবেন?
রাগের মুহূর্তে নিজেকে সামলানো কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়। প্রথমেই বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করুন। কোন বিষয়গুলো আপনাকে বেশি রাগিয়ে তোলে। এই ‘ট্রিগার’ চেনা থাকলে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়।
যখন রাগ তীব্র হয়ে ওঠে তখন পরিস্থিতি থেকে সাময়িকভাবে সরে আসুন। নিশ্চিত করুন আপনি ও সন্তান দুজনই নিরাপদ। ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নিন আর ছাড়ুন। মনে মনে ১ থেকে ১০ পর্যন্ত গুনতে পারেন। চাইলে আশপাশের পাঁচটি জিনিস চোখে দেখে। চারটি শব্দ শুনে নিজের মনোযোগ বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনুন। শরীরের পেশিগুলো একে একে শিথিল করার চেষ্টা করুন। এতে নার্ভ শান্ত হয়।
পরিবারে একটি ‘কোড শব্দ’ ঠিক রাখতে পারেন। যা বললে অন্যরা বুঝবে আপনি এখন একটু বিরতি চান। এতে বাড়তি কথা বা অপ্রয়োজনীয় দ্বন্দ্ব এড়ানো যায়। নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, লেখা বা আঁকার মতো সৃজনশীল কাজও রাগ কমাতে দারুণ সহায়ক।
প্রয়োজনে পেশাদার সাহায্য নিন
বারবার রাগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তা অবহেলা না করে সহায়তা নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। গবেষণায় দেখা গেছে, রাগ ব্যবস্থাপনা থেরাপি নেওয়া মানুষের বড় অংশই ইতিবাচক পরিবর্তন অনুভব করেন। থেরাপিস্টের সঙ্গে কথা বললে নিজের অনুভূতি বোঝা ও সামলানো অনেক সহজ হয়।
এ ছাড়া অভিভাবকদের জন্য গ্রুপভিত্তিক রাগ ব্যবস্থাপনা প্রোগ্রামও বেশ কার্যকর। এতে একদিকে যেমন প্রয়োজনীয় কৌশল শেখা যায়। অন্যদিকে একা নন এই উপলব্ধিটাও শক্তি দেয়। অনলাইন ও অফলাইন নানা কোর্সও এখন সহজলভ্য।

সন্তানের আবেগ বোঝার শিক্ষক হন
শুধু আপনার নয় সন্তানের মনেও রাগ, হতাশা বা ক্ষোভ আসতেই পারে। বাবা–মা হিসেবে আপনার কাজ হলো সেই আবেগগুলো কীভাবে সুস্থভাবে প্রকাশ করতে হয় তা শেখানো। নিজে শান্ত থাকার চেষ্টা করে আপনি তাদের জন্য সবচেয়ে শক্ত উদাহরণ তৈরি করেন।
শিশুকে দৌড়ানো, খেলাধুলা, আঁকা বা ডায়েরি লেখার মতো কাজে উৎসাহ দিন। কেন তাদের রাগ লাগছে, সেটি কথা বলিয়ে জানার চেষ্টা করুন। তারা যখন শান্তভাবে রাগ সামলাতে পারে। ছোট সাফল্যের জন্যও তাদের প্রশংসা করুন। এতে আত্মবিশ্বাস বাড়ে।
অতিরিক্ত রাগের নীরব ক্ষতি
ঘন ঘন চিৎকার চেঁচামেচি বা রাগের বিস্ফোরণ শিশুর মনে গভীর ছাপ ফেলে। এতে তাদের মস্তিষ্কের তথ্য গ্রহণ ও আবেগ সামলানোর ক্ষমতাও প্রভাবিত হতে পারে। ভয় বা রাগের পরিবেশে বড় হওয়া শিশুরা অনেক সময় আরও জেদি হয়ে ওঠে উদ্বেগ বা বিষণ্নতায় ভোগে।
এ ধরনের মানসিক চাপ থেকে মাথাব্যথা, পেটব্যথার মতো শারীরিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি অন্যদের ওপর ভরসা করা বা সামাজিক সম্পর্ক গড়তেও তারা পিছিয়ে পড়ে।
রাগ আসা দোষের নয়, কিন্তু সেটাকে কীভাবে প্রকাশ করছেন, সেটাই আসল। আজ একটু সচেতন হলেই আপনার সন্তান পাবে আরও নিরাপদ, শান্ত ও ভালোবাসায় ভরা একটি শৈশব।



