বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
নারী

সন্তানের খোঁজে প্রতিদিন রায়েরবাজার কবরস্থানে অসহায় এক মা

Untitled-2

জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো ছেলে সোহেল রানাকে খুঁজে ফিরছেন মা রাশেদা বেগম। প্রতিদিন ভোরে হাতে ছেলের ছবি নিয়ে তিনি ছুটে যান রায়েরবাজার কবরস্থানে। অজ্ঞাতনামা কবরগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন হয়তো কোনোভাবে সন্তানের খোঁজ মিলবে। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ছেলে হারানোর সেই নির্মম দিনের পর একটিও সকাল তার এই অপেক্ষাহীন যায়নি। রাতেও ছেলের নাম ধরে ঘুমের ঘোরে কেঁদে ওঠেন তিনি।

রোববার, ৭ ডিসেম্বর, জুলাই–আগস্টের আন্দোলনে নিহত অজ্ঞাতনামা শহীদদের ডিএনএ শনাক্তের কাজ শুরু করেছে সিআইডি। এ উদ্যোগে নতুন আশা দেখছেন সোহেল রানার পরিবার।

রাশেদা বেগম জানান, ছেলে শহীদ হওয়ার পর তারা ছুটে যান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে তিনি নিশ্চিতভাবে ছেলের মরদেহ দেখলেও হাসপাতাल কর্তৃপক্ষ তাদের হাতে মরদেহ তুলে দেয়নি। আকুতি–মিনতি করে ছেলের মরদেহ নিতে চাইলে উল্টো তাদের হাসপাতাল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে জানতে পারেন, তার সন্তানকে বেওয়ারিশ পরিচয়ে রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। সেই খবর শোনার পর থেকেই রাশেদা বেগম প্রতিদিন কবরস্থানে ছুটে আসছেন, হয়তো কোথাও কোনো কবরের নিচে তার সন্তান শায়িত—এই আশায় তিনি প্রতিদিন দাঁড়িয়ে থাকেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

সোহেলের বাবা লাল মিয়া বলেন, ১৮ জুলাই ছেলের গুলিবিদ্ধ অবস্থার একটি ভিডিও দেখে তারা নিশ্চিত হন ছেলে শহীদ হয়েছেন। তারপরই ছেলের মরদেহ নেওয়ার জন্য হাসপাতাল ছুটে যান। কিন্তু হাসপাতাল তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তাদের জানানো হয়—‘উপর থেকে নির্দেশ আছে, মরদেহ দেওয়া যাবে না।’ বহু অনুরোধেও কাজ হয়নি; বরং পরে হাসপাতালের ভেতর ঢুকতেও দেওয়া হয়নি তাঁদের।

সোহেলের ছোট ভাই আলভিন নাভিল জানান, তার ভাই গার্মেন্টস ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। আন্দোলনে যোগ দিয়ে যাত্রাবাড়ীতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। খবর পেয়ে প্রথমে মিটফোর্ড ও পরে ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে বহু মরদেহের ভিড়ের মধ্যে তাদের ভাইকে খুঁজে পান। কিন্তু হাসপাতাল তাদের হাতে মরদেহটি হস্তান্তর করেনি। পরে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম সংস্থা মরদেহটি নিয়ে যায়। সেখানে গিয়েও তাঁরা কোনো তথ্য পাননি। সংস্থা তাদের জানায়, মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

নাভিল বলেন, ভাইকে হারিয়ে তাদের পুরো পরিবার ভেঙে পড়েছে। মা প্রতিদিন কবরস্থানে এসে ছবি হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন। সন্ধ্যায় তারা জোর করে তাকে বাড়িতে নিয়ে যান, কিন্তু ঘরে গিয়েও তিনি সারারাত কাঁদেন। বাবা–মা দুজনেই প্রায় পাগলপ্রায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। পরিবারের কারও ঠিকমতো ঘুম হয় না, খাবারও গলাধঃকরণ করতে পারেন না।

তিনি আরও বলেন, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে ভাইয়ের মরদেহ শনাক্তের কাজ শুরু হওয়ায় তাদের নতুন করে আশা জন্মেছে। অন্তত ভাইয়ের মরদেহটি খুঁজে পেলে তাঁরা কিছুটা সান্ত্বনা পাবেন।

Advertisements