নারীর দাবি কেন এখনো সামষ্টিক দাবি হয়ে ওঠে না

জনশুমারি বলছে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী। কিন্তু বাস্তবতায় নারীর অবস্থান এখনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে গৌণ। কারণ বিষয়টি সংখ্যার নয়, বরং ক্ষমতার। সমাজে সিদ্ধান্ত তৈরির ক্ষমতা যার হাতে, সে-ই মূল কর্তৃত্বশীল; আর সেই জায়গাটি এখনও পুরুষের দখলে।
সংখ্যায় এগিয়ে থেকেও নারীর অধিকার কেন দুর্বল
নারী কী পোশাক পরবেন, কোথায় যাবেন, কীভাবে কাজ করবেন—এই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তগুলো এখনো সমাজ নির্ধারণ করে। নারী বৃদ্ধি, শিক্ষা, কর্মক্ষেত্রে অবদান—সবকিছুর পরও তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা কমেনি, বরং আরও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি নারীদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে “ঘরে সময় দেওয়া” নিশ্চিত করার রাজনৈতিক বক্তব্যই তার উদাহরণ। এটি কর্মজীবী নারীর সংগ্রাম, দায়িত্ব ও সামর্থ্য—সবকিছুকেই হেয় করে।
নারীর ইস্যু—কেন শুধুই নারীর লড়াই মনে হয়
নারী অধিকার বা নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে এলে নারীরাই বেশি প্রতিবাদ করেন। পুরুষের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে অল্প। অথচ নারীর ওপর আরোপিত যেকোনো বৈষম্যের প্রভাব পুরুষকেও আঘাত করে।
শ্রমবাজারের প্রায় অর্ধেক নারী। পরিবার, স্বাস্থ্য, সামাজিক যত্ন—এই ক্ষেত্রগুলো নারীর ওপর নির্ভরশীল। কর্মক্ষেত্র থেকে নারীকে সংকুচিত করলে পুরুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। এই বাস্তবতা সত্ত্বেও নারীর অধিকারের প্রশ্ন যেন নারীর একার দায় হয়ে থাকে।
নীরব পুরুষ সমাজের বিভ্রান্তি
নারী নির্যাতন বা বৈষম্যের ঘটনা ঘটলে কেউ কেউ নারীদেরই শুধু বলেন—“জেগে উঠুন।”
নারীবাদীদের দিকে তাকিয়ে থাকা বা নারীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানানোর মধ্যে একটি ভুল ধারণা আছে—যেন নারী অধিকার কেবল নারীর দায়িত্ব। কিন্তু মানবাধিকার রক্ষায় লিঙ্গভেদ নেই। প্রত্যেকে সমান দায়বদ্ধ।
সংসদ, নীতি, সিদ্ধান্ত—সবই কেন পুরুষের হাতে
নারী ভোটারের সংখ্যা বেশি, নারী শ্রমশক্তি বিস্তৃত, নারী দেশের অগ্রগতির এক বড় শক্তি। তবু সংসদে নারীর অংশগ্রহণ বা নীতি নির্ধারণে তাদের অবস্থান কম।
এমনকি নারীর প্রতিনিধিত্ব সম্পর্কেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পুরুষেরা নেন।
এ নীরবতা ও অনাগ্রহই নারীর দাবি–দাওয়াকে সমাজে প্রান্তিক করে রাখে।
নারীর অধিকার সবার জন্য জরুরি—কারণ নারী নিরাপদ না হলে পরিবার নিরাপদ নয়। নারী স্বাধীন না হলে সমাজ অগ্রসর হয় না। নারী পিছিয়ে পড়লে রাষ্ট্রই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুতরাং নারীর দাবি কোনো বিশেষ শ্রেণির দাবি নয়; এটি সমগ্র সমাজের দাবি।
সমাধান কোথায়
নারীর ইস্যুকে নারীর দায়িত্ব হিসেবে দেখার মানসিকতা বদলাতে হবে।
যতক্ষণ না—পরিবারে, রাজনীতিতে,কর্মক্ষেত্রে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তরে পুরুষ সমানভাবে অংশ নেয়, ততক্ষণ নারীর অগ্রগতি অর্ধেক পথেই আটকে থাকবে।



