ফরাসি নারীদের শিক্ষাদিগন্তে পথিকৃৎ — জুলি-ভিকতোয়া ডোবিয়ে

ইতিহাসে এমন কিছু নারী আছেন, যাদের একক সাহস সমাজের মানচিত্রই বদলে দেয়। উনবিংশ শতাব্দীর ফ্রান্সে, যখন নারী শিক্ষা ছিল সামাজিকভাবে প্রায় নিষিদ্ধ এক ধারণা, তখনই আবির্ভূত হয়েছিলেন জুলি-ভিকতোয়া ডোবিয়ে এক অনমনীয় মনের মানুষ, যিনি প্রমাণ করেছিলেন জ্ঞানের আলো কখনও লিঙ্গভেদ মানে না। অগণিত প্রতিবন্ধকতা, সামাজিক নিন্দা আর প্রশাসনিক অস্বীকৃতির পরও তিনি উচ্চশিক্ষার দরজা খুলে দিয়েছিলেন ফরাসি নারীদের জন্য।
১৮৬১ সালের ১৭ আগস্টের সেই দিনটি তাই শুধু তাঁর জীবনের নয়, ফ্রান্সের শিক্ষা ইতিহাসের এক দীপ্ত অধ্যায় যেদিন একজন নারী প্রথমবারের মতো উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
ফ্রান্সের শিক্ষামন্ত্রী গুসতাভ রোলাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এমন অচেনা সংকটে পড়েননি আগে। তাঁর টেবিলে জমে থাকা একটি ফাইলে স্বাক্ষর করলেই ইতিহাস রচিত হবে অথচ সেটিতেই তিনি ছয় মাস ধরে হাত দিতে সাহস পাননি। কারণ, ফাইলের মালিক একজন নারী: জুলি-ভিকতোয়া দোবিয়ে। সমাজের রক্ষণশীল অংশ তত দিনে সরব, তাঁদের ভাষ্য “নারীরা যদি পুরুষদের সমান শিক্ষিত হয়, সমাজ ধ্বংস হবে।” অন্যদিকে প্রগতিশীল মহল সমানভাবে চাপে রেখেছিল মন্ত্রীকে। অবশেষে সম্রাজ্ঞী ইউজেনির সরাসরি নির্দেশে বাধ্য হয়ে, ১৮৬১ সালের ১৭ আগস্ট স্বাক্ষর করেন তিনি। সেই মুহূর্তেই ফ্রান্সের ইতিহাসে প্রথমবার একজন নারী সরকারি স্বীকৃতি পান উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ হিসেবে।
১৮২৪ সালের ২৬ মার্চ, ফ্রান্সের ভোস জেলার বেইঁ-লে-বেন শহরে জন্মগ্রহণ করেন জুলি-ভিকতোয়া দোবিয়ে। আট ভাইবোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ এই কন্যার শৈশব কেটেছিল সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সীমাবদ্ধতার মধ্যেই। অল্প বয়সেই পিতৃহারা হয়ে পড়লেও শিক্ষার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। তাঁর এক ভাই ছিলেন পাদরি তাঁর কাছেই গ্রিক ও লাতিন ভাষায় হাতেখড়ি হয় জুলির। পরবর্তীতে ইতিহাস, সাহিত্য ও জার্মান ভাষা শিখে তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তোলেন এক আত্মনির্ভর গবেষক হিসেবে।

১৮৪৪ সালে তিনি “শিক্ষকযোগ্যতার সার্টিফিকেট” অর্জন করেন, যা তখন নারীদের জন্য বিরল অর্জন। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন সেখানেই থেমে থাকেনি। তিনি চেয়েছিলেন ফ্রান্সের জাতীয় উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিতে যা তখন নারীদের জন্য অকল্পনীয় সাহসিকতার কাজ। প্যারিস ও এইক্স শিক্ষা পর্ষদ তাঁর আবেদন ফিরিয়ে দেয়, কারণ “নারীদের জন্য সে সুযোগ নেই।” অথচ আইনগতভাবে তা নিষিদ্ধও ছিল না। বহু দরজায় ধাক্কা খাওয়ার পর অবশেষে লিওঁ শিক্ষা পর্ষদ তাঁকে পরীক্ষার অনুমতি দেয়, তবে শর্ত ছিল তাঁকে সম্পূর্ণ একা প্রস্তুতি নিতে হবে। পরীক্ষার সময়ও তাঁকে আলাদা কক্ষে বসিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়।
তবু তিনি থেমে যাননি। ৩৭ বছর বয়সে, নিজের একক প্রচেষ্টায়, সব বাধা উপেক্ষা করে, কৃতিত্বের সঙ্গে তিনি উত্তীর্ণ হন। সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় শিরোনাম হয়
“তীক্ষ্ণ মেধা ও অপরাজেয় ইচ্ছাশক্তিতে মাদমোয়াজেল ডোবিয়ে নারীদের জন্য জ্ঞানের নতুন দ্বার খুলে দিলেন।”
উচ্চমাধ্যমিক পেরোনোর পর দোবিয়ে প্যারিসের সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। কিন্তু তাঁকে পুরুষ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে বসার অনুমতি দেওয়া হয়নি। লেকচার শুনতে হতো আলাদা কক্ষে, অনেক সময় শুধুমাত্র পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হতো তাঁকে। সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও তিনি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন ১৮৭১ সালের ২৮ অক্টোবর— ফ্রান্সের প্রথম নারী হিসেবে।
জুলি-ভিকতোয়া দোবিয়ে শুধু পরীক্ষায় সফল হননি, নারী শিক্ষার সামাজিক প্রেক্ষাপটও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছিলেন। তাঁর লেখা “La Femme pauvre au XIXᵉ siècle” (১৯শ শতাব্দীর দরিদ্র নারী) বইটি ফ্রান্সের নারী শিক্ষার বাস্তব অবস্থা, সামাজিক বৈষম্য ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে এক ঐতিহাসিক দলিল। এই বইটি লিওঁ একাডেমি অব সায়েন্সেস পুরস্কার অর্জন করে।
তাঁর জীবনের শেষ প্রাপ্তি হতে পারত ডক্টরেট ডিগ্রি সেটির প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু তত দিনে ফুসফুসে বাসা বেঁধেছে মরণব্যাধি যক্ষা। ১৮৭৪ সালের ২৬ আগস্ট, মাত্র ৫০ বছর বয়সে তিনি চলে যান। জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি লিখে গেছেন নারী শিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে।
ফরাসি সরকার ও সমাজ তাঁর অবদান কখনও ভোলেনি। তাঁর নামে গড়া হয়েছে বিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট, প্রকাশিত হয়েছে স্মারক ডাকটিকিট। ২০২৪ সালে তাঁর জন্মের ২০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ফ্রান্স তাঁকে জাতীয়ভাবে শ্রদ্ধা জানায়।
জুলি-ভিকতোয়া দোবিয়ে কেবল একজন নারী শিক্ষার্থী ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক আন্দোলন, এক বিপ্লবের নাম। তাঁর হাত ধরেই ফরাসি নারীরা প্রবেশ করেছিল শিক্ষার মূলধারায়। সমাজ যখন বলেছিল “নারীরা পারে না”, তিনি দেখিয়েছিলেন “নারীরা পারেই”এবং ইতিহাসে রেখে গেছেন এক অমোঘ সত্য:
আলোর মৃত্যু নেই, আর জ্ঞানেরও না।



