বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
জীবনযাপন

শিশুর কথা বলতে দেরি?

13-SM904819

অনেক বাবা–মা ভাবেন শিশুর কথায় দেরি হওয়া স্বাভাবিক। বয়স বাড়লেই ঠিক হয়ে যাবে। কখনো সত্যি হয়। কিন্তু অনেক সময় এই দেরি একটি বড় সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। শিশুর কথা বলা বা স্পিচ ডেভেলপমেন্ট একটি ধাপে ধাপে শেখার প্রক্রিয়া। দুই মাস বয়সেই একটি সুস্থ শিশু বিভিন্ন শব্দ করে আশপাশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে। ছয় থেকে আট মাসে শুরু হয় বাবলিং, বা বা, দা দা ধরনের আওয়াজ। এক বছর বয়সে অন্তত একটি অর্থপূর্ণ শব্দ বলতে পারে। ১৬ থেকে ২০ মাসে তার শব্দভান্ডার বাড়ে। ১০ থেকে ৫০টি শব্দ ব্যবহার করতে পারে। দুই বছরে সে দুটি শব্দ জুড়ে ছোট বাক্য বলে “আমি খাব”, “এটা কী?” এগুলো স্বাভাবিক। তিন বছরে তিন–চারটি শব্দের বাক্য বলতে পারে। চার বছরে বোঝে ও বলে আরও জটিল বাক্য ছড়া–কবিতাও আবৃত্তি করতে শেখে। এই স্বাভাবিক ধাপগুলো ব্যাহত হলেই তাকে বলা হয় স্পিচ ডিলে।

এই সমস্যার কারণ একাধিক। শিশুর শ্রবণ সমস্যা থাকলে সে শব্দ সঠিকভাবে শুনতে বা অনুকরণ করতে পারে না। আবার মস্তিষ্কের বিকাশজনিত সমস্যা যেমন অটিজম, সেরিব্রাল পালসি বা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতার ক্ষেত্রেও ভাষা শেখার গতি ধীর হয়ে যায়। ডাউন সিনড্রোমসহ বিভিন্ন সিনড্রোমের শিশুদের ক্ষেত্রেও কথা বলা দেরিতে হয়। ভাষাগত বিকাশের আরেক সমস্যা হলো ডেভেলপমেন্টাল ল্যাঙ্গুয়েজ ডিজঅর্ডার এখানে শিশুর বুদ্ধি ও শুনতে পারার ক্ষমতা স্বাভাবিক হলেও কথা বলায় বয়সের তুলনায় পিছিয়ে থাকে। তোতলানো বা নির্দিষ্ট পরিবেশে চুপ থাকা (Selective Mutism) এর অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া মুখগহ্বরের সমস্যা, যেমন টাং টাই, ঠোঁটকাটা, তালুকাটা এসবের কারণেও উচ্চারণে বাধা তৈরি হয়ে স্পিচ ডিলে হতে পারে।

শুধু শারীরিক বা স্নায়ুবিক কারণই নয় পরিবেশগত কারণও গুরুত্বপূর্ণ। ছোট শিশু যদি সারাদিন মোবাইল বা ট্যাবের পর্দায় বুঁদ হয়ে থাকে, তার সঙ্গে কথোপকথনের সুযোগ কমে যায়। ভাষা শেখার মূল মাধ্যম হলো মানুষে-মানুষে যোগাযোগ, স্ক্রিনে নয়। অনেক সময় শিশুরা একসঙ্গে দুই ভাষার সংস্পর্শে এসে বিভ্রান্ত হয়. ফলে কথা শেখা ধীর হয়। আবার একক পরিবারে বড় হলে, খেলাধুলার সঙ্গী না থাকলে বা সামাজিক যোগাযোগ সীমিত হলে শিশুর ভাষা ব্যবহারের সুযোগ কম পায়।

স্পিচ ডিলে বোঝা মাত্রই আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক কারণ নির্ণয় করা জরুরি। এ জন্য শিশুবিশেষজ্ঞ বা শিশুস্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। জন্মের সময়ে কোনো জটিলতা ছিল কি না, পরিবারে কারও একই সমস্যা আছে কি না এসব ইতিহাস জানা খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে শিশুর শ্রবণ পরীক্ষা, মানসিক মূল্যায়ন বা অটিজম–সংক্রান্ত পরীক্ষা করা হয়।

সমাধান নির্ভর করে মূল সমস্যার ওপর। যদি শ্রবণ সমস্যা থাকে, প্রথমে সেটির চিকিৎসা। প্রয়োজনে হিয়ারিং এইড বা ককলিয়ার ইমপ্লান্ট, এরপর স্পিচ থেরাপি। মুখগহ্বরের সমস্যা যেমন টাং টাই থাকলে ছোট অস্ত্রোপচারের পর থেরাপি শিশুকে দ্রুত সাহায্য করে। সেরিব্রাল পালসি বা অটিজমের ক্ষেত্রে আর্লি ইন্টারভেনশন, স্পিচ ও অকুপেশনাল থেরাপির সমন্বয় শিশুদের অনেকটাই উন্নতির পথে আনে। ডেভেলপমেন্টাল ল্যাঙ্গুয়েজ ডিজঅর্ডারেও নিয়মিত থেরাপি ভালো ফল দেয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাবা–মায়ের সক্রিয় ভূমিকা। শিশুর সঙ্গে নিয়মিত কথা বলুন, চোখে চোখ রেখে গল্প করুন, জিনিসের নাম বলুন, গান বা ছড়া শোনান। তাকে অনুকরণের সুযোগ দিন কিন্তু চাপ দেবেন না। আর সবচেয়ে জরুরি স্ক্রিন টাইম কমান। বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে।শিশুর কথা বলতে দেরি হলে সেটিকে “সময় হলে হয়ে যাবে” বলে এড়িয়ে না গিয়ে কারণটি খুঁজুন ও পদক্ষেপ নিন। যত দ্রুত সমাধানের পথে এগোনো যায়, শিশুর ভাষাগত বিকাশের পথও ততটাই সহজ হয়।

Advertisements
Advertisements