নারী অধিকার নিয়ে কার্টুনে প্রতিবাদ, অনলাইনে কটূ মন্তব্যের ঝড়

প্রতিবাদের ভাষা শুধু বক্তৃতা বা স্লোগান নয়, চিত্রও কথা বলে। সেই চিত্র, সেই রেখা ও রঙের ভাষা হয়ে উঠেছে অনেক নারী শিল্পীর প্রতিবাদের হাতিয়ার। সমাজে নারীদের প্রতি বৈষম্য, অবমূল্যায়ন ও সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অস্ত্র হিসেবে তাঁরা বেছে নিয়েছেন কার্টুন এক শক্তিশালী ও সংবেদনশীল মাধ্যম।
‘জামাটা কেমন পরেছে’, ‘বাচ্চা নিয়ে চাকরি করবে কীভাবে’, ‘স্বামীর তো অনেক আয়, চাকরি করে লাভ কী’ এমন মন্তব্য আজও নারীদের নিত্যদিনের বাস্তবতা। জন্মের পর থেকে পোশাক, চলাফেরা, বিয়ে, সন্তান নেওয়া বা চাকরি করার সিদ্ধান্ত সবকিছু যেন সমাজই নির্ধারণ করে দেয় নারীর জন্য। এই বৈষম্যের গল্পই আঁকা হয়েছে কার্টুনে, তীক্ষ্ণ রেখা আর ব্যঙ্গাত্মক হাসির আড়ালে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত প্রদর্শনীতে সেই গল্পই ফুটে উঠেছে। রঙ, রেখা আর প্রযুক্তির মিশেলে তৈরি চিত্রগুলোয় দেখা গেছে নারীজীবনের নানা বাস্তবতা—গণপরিবহনে হেনস্তা, কটূ মন্তব্য, ভিডিও ধারণ, কিংবা সাইবার বুলিং। এক কার্টুনে দেখা যায়, এক নারী নভোচারী চাঁদে গবেষণা করছেন, পেছনে পৃথিবী থেকে ভেসে আসছে কণ্ঠ “ওড়না কোথায়?”
দর্শনার্থী সৈয়দা আফরিন বলেন, “এই প্রদর্শনীর প্রতিটি ছবিই যেন একেকজন নারীর বাস্তব জীবন। রাস্তায়, বাসে, কর্মক্ষেত্রে আমরা প্রতিদিন এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই যাই।”
তবে বাস্তবতার মতোই কঠিন অনলাইন জগৎও। নারীকে নিয়ে আঁকা কার্টুন পোস্ট হলেই ভরে যায় কটূ মন্তব্যে। কার্টুনিস্ট ও শিক্ষক সামিয়া সাবিহা রিনি বলেন, “নারী নিয়ে কাজ করলেই নানা ট্যাগ জুড়ে দেওয়া হয়। মাতৃত্ব বা নারীশক্তি নিয়েও কেউ ভালোভাবে নিতে পারে না। অনলাইন মন্তব্যের এই বিষাক্ততা বদলাতে হবে।”
প্রদর্শনীতে একটি কাঠের চাকায় ঘুরে ফুটে উঠেছে নারীর জীবনের ধারা—শৈশব থেকে সংসার, দায়িত্ব, আত্মত্যাগ পর্যন্ত। দর্শক সাবিনা বলেন, “আমরা নারীদের কাজকে সাধুবাদ দিই না। এই অবহেলাই তাদের ভেতর থেকে ভেঙে দেয়।”
প্রদর্শনীর এক প্রান্তে ছিল নকশিকাঁথার ফোঁড়ে লেখা এক চিঠি—মেয়ের মাকে উদ্দেশে। শিল্পী নুসরাত লাক্সুমী বলেন, “আমার মা গান শিখতেন, বিয়ের পর থেমে যান। আমি সেই না-পাওয়া স্বপ্নগুলোই এঁকেছি চিঠির ফোঁড়ে।”
একসময় সংবাদপত্রে সমাজের প্রতিবিম্ব হিসেবে কার্টুন ছিল নিয়মিত। ডিজিটাল যুগে সেটি কিছুটা হারিয়ে গেলেও হারায়নি তার প্রতিবাদের শক্তি। আজও কার্টুন সমাজের অসংগতি ও নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ অস্ত্র।



