বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ২০ মে, ২০২৬
বিনোদন

সিনেমা ও নাটকে নারীপ্রধান গল্প এখন নেই বললেই চলে

WhatsApp Image 2025-11-02 at 16.46.38_16f3bab8

সামাজিক প্রেক্ষাপটেও যেমন নারী পুরুষকে একই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয় না, তেমনি নাটক-সিনেমায় নজর দিলেই দেখা যাবে এখনো নারী চরিত্র ও নারী সংগ্রামের গল্প উপেক্ষিত। নারী চরিত্র থাকলেও, তা গুরুত্বহীন। শুধুই মা, স্ত্রী, বোন এসব চরিত্রেই সীমাবদ্ধ গল্প।

আশি- নব্বই দশকের দিকে নারীপ্রধান কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ ছিল। একাত্তর-পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক যেসব সিনেমা নির্মাণ হয়েছে তাতে নারীর অবদান ও তাদের নির্যাতনের চিত্র নির্মাতারা তুলে ধরেছেন। সুভাষ দত্ত পরিচালিত ১৯৭২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি সিনেমা ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’। এতে তো স্লোগানই ছিল-‘লাঞ্ছিত নারীত্বের মর্যাদা দাও, নিষ্পাপ সন্তানদের বরণ কর’।

হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা ‘আগুনের পরশমণি’-তে রাত্রি চরিত্রটির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকালীন একজন সহজ-সরল মেয়ে কীভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতে সাহসী হয়ে ওঠেন তা দেখানো হয়েছে। ১৯৯৪ সালের এ সিনেমাটি আট বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে নেয়।

প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেন একাধিক নারীপ্রধান সিনেমা নির্মাণ করেছেন। যেমন ‘নয়নমণি’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সুন্দরী’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘সখিনার যুদ্ধ’ প্রভৃতি। এসব সিনেমা কিন্তু দর্শক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, পাশাপাশি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারেও ভূষিত হয়।

এছাড়া আবদুল্লাহ আল মামুনের ‘সারেং বৌ’, চাষী নজরুল ইসলামের ‘শান্তি’ ও ‘সুভা’, আলমগীর কবিরের ‘সূর্যকন্যা’, সুচন্দা প্রযোজিত ‘তিন কন্যা’, ‘হাজার বছর ধরে’, নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘আলোর মিছিল’, হারুনর রশীদের ‘মেঘের অনেক রঙ’, নারগিস আক্তারের ‘চার সতীনের ঘর’, ‘মেঘের কোলে রোদ’, ‘মেঘলা আকাশ’, ‘অবুঝ বউ’, ‘পৌষ মাসের পিরিত’, ‘যৌবতী কন্যার মন’, এ কে সোহেলের ‘খায়রুন সুন্দরী’, মৌসুমীর ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’, ‘মেহের নিগার’, জয়া আহসান প্রযোজিত ‘দেবী’সহ আরও অনেক সিনেমা নারীপ্রধান গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে।

ছোট পর্দায় নজর দিলে দেখা যাবে, আশির দশক পর্যন্তই নারীপ্রধান গল্পের প্রাধান্য ছিল। এরপর ধীরে ধীরে নারীকে উপজীব্য করে গল্প নির্মাণ কমে যায়। সে সময় নির্মিত হয়েছে ‘সংশপ্তক’, ‘আজ রবিবার’, ‘অয়োময়’, ‘রাহু’সহ প্রচুর নাটক, যেখানে নারী চরিত্রের প্রাধান্য ছিল।

এখন তো নারীপ্রধান গল্পের নাটক সিনেমা নির্মাণ হয় না বললেই চলে, দু’একটি কাজ হয়। নারীপ্রধান সিনেমা ও নাটকের পরিমাণ ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার কারণ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত অভিনেত্রী সুচন্দা বলেন, ‘আমাদের সমাজে নারীরা সবসময়ই উপেক্ষিত। নারীদের আনন্দ-বঞ্চনা নিয়ে সিনেমা নির্মাণ নারীদের হাতেই যথাযথভাবে ফুটে ওঠে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের ঢাকাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে নারী নির্মাতার অংশগ্রহণ কম। যেসব নারী নির্মাতা ইতোমধ্যে সিনেমা নির্মাণ করেছেন তাদের গল্পে নারীদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার চিত্র সুচারুরূপে ফুটে উঠেছে এবং সফল হয়েছে। এখন সিনেমার দুঃসময় চলছে। এমনিতেই এ শিল্পে কেউ বিনিয়োগ করতে চায় না। যদি কোনো দিন আবার সিনেমার সুদিন ফিরে আসে, তাহলে অবশ্যই নারীপ্রধান সিনেমা নির্মাণে নারীদের এগিয়ে আসতে হবে।’

প্রখ্যাত অভিনেত্রী শাবানা এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমে বলেন, ‘একজন নারী হিসাবে আমি যখন নির্মাণ করি তখন তাতে নারীদেরই প্রাধান্য দেই। বর্তমান সময়ে নারীপ্রধান সিনেমা তেমনভাবে আর নির্মিত হয় না। আমি আমার নির্মিত সিনেমাগুলো নারীপ্রধান গল্প নিয়েই নির্মাণ করেছি।’

নির্মাতা নার্গিস আক্তার বলেন, ‘নারীরা বেশিরভাগই পুরুষদের দ্বারা নিগৃহীত হয়ে থাকে। তাই একজন পুরুষ নির্মাতা যখন নারীপ্রধান নাটক বা সিনেমা নির্মাণ করতে যান তখন তারা তাদের এ দুর্বল অবস্থানকে যথাযথভাবে ফুটিয়ে তোলার সাহস পান না। ফলে নারীদের সুখ-দুঃখ, প্রাপ্তি-বঞ্চনার কথা আড়ালেই থেকে যায়। তাই নারীদের কথা নারীদেরই তুলে ধরতে হবে। আমি এ পর্যন্ত যত সিনেমা নির্মাণ করেছি সবই নারীপ্রধান। আসলে এখন নারী নির্মাতার সংখ্যা কম বলেই নারীপ্রধান নাটক ও সিনেমার সংখ্যাও কম।’

নাটক-সিনেমায় অভিনয়ে নিজেদের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন অনেক অভিনেত্রী। নারী হিসাবে তাদের অবস্থান বেশ শক্ত হলেও কর্মক্ষেত্রে এখনো বৈষম্যের শিকার বলে মনে করেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন, শবনম ইয়াসমিন বুবলী ও বিদ্যা সিনহা মিম। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তার দর্শকদের ভালোবাসা কুড়িয়েছেন দু’হাত ভরে। অভিনয়ের পাশাপাশি নারীদের নিয়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও তারা এগিয়ে। নাটক-সিনেমায় নারীদের গুরুত্ব কতটুকু এ প্রসঙ্গে কথা বলেছেন এ তিন নারী।

বিদ্যা সিনহা মিম বলেন, ‘বাংলাদেশের সিনেমা, টিভি নাটক কিংবা ওয়েব সিরিজ-সব জায়গাতেই নারীকেন্দ্রিক গল্প খুবই কম হয়। হয়তো বাণিজ্যিক কারণে ঝুঁকি আছে কিংবা দর্শকরা নেবে না এমন গল্প, এটা মনে করেন নির্মাতারা। কিন্তু বিষয়টি আমি যৌক্তিক বলে মনে করি না। এদেশে নারীকেন্দ্রিক গল্পের নাটক সিনেমার সাফল্যও আছে অনেক।’

আজমেরী হক বাঁধন বলেন, ‘সমাজে নারীরা সবক্ষেত্রে বঞ্চিত। শুধু মিডিয়া কেন নারীরা পরিবারে ও কর্মক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সর্বক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। শোবিজে এখনো নারী প্রতিভা মেলে ধরার সেভাবে কোনো সুযোগ দেওয়া হয় না বা থাকে না। নারী চরিত্রগুলোকে গল্পেই হত্যা করা হয়। প্রযোজক-পরিচালকরা এগিয়ে এলে আমাদের দেশে নারীপ্রধান গল্পের ভালো ভালো কাজ করা সম্ভব।’

বর্তমান সময়ে তো নাটক-সিনেমায় নারীপ্রধান গল্পের প্রাধান্য নেই বললেই চলে। শুধু পর্দায়ই নয়, নারীপ্রধান গল্পে কাজ করতে নির্মাতারাও তেমন সুযোগ পাচ্ছেন না। এক সময় নারী চরিত্রের কিছুটা গুরুত্ব থাকলেও, বর্তমানে নারীকে শুধু শো-পিস হিসাবেই ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও মনে করছেন অনেকে।