আধুনিক যুগেও কন্যাশিশুকে বোঝা মনে করা হয়

প্রচলিত সমাজে এখনো মানুষ ছেলে ও মেয়েসন্তানের মধ্যে পার্থক্য করে। আধুনিক এ যুগে কন্যাসন্তানকে বোঝা মনে হয়। শুধু আমাদের দেশে না আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের মতো বড় বড় দেশেও এ মনোভাব বিদ্যমান। প্রকৃতির নিয়মে একজন ছেলেসন্তান যেভাবে জন্ম নেয়, একজন মেয়েসন্তানও ঠিক সেভাবেই জন্ম নেয়। প্রকৃতি ছেলেসন্তান ও মেয়েসন্তানের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ করে না কিন্তু মানুষ করে। আমাদের সমাজে কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য মাকে দায়ী করা হয়। অথচ একজন বাবাই সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকেন।
আরব দেশে যখন কন্যাশিশুদের জন্মের পর হত্যা করা হতো, তখন তাদের রক্ষার্থে হজরত মুহাম্মদ (সা.) এলেন। তিনি শুধু কন্যাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করলেন না, নিজের জীবন ফাতেমাময় করে দেখালেন কন্যা কত আদরণীয়া। সনাতন ধর্মে মিথিলা রাজজনক নিজের জীবন সীতাময় করে দেখালেন কন্যারত্ন অমূল্য। অথচ দেবী সীতা তাঁর ঔরসজাত সন্তান ছিলেন না। কিন্তু এখনো ধর্মের দোহাই দিয়ে আমাদের দেশে কন্যাসন্তানদের প্রতি বৈষম্য ও অবহেলা করা হয়। যদিও বিশ্বের অধিকাংশ দেশে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইন করা হয়েছে।

অনেক মা-বাবা সন্তানদের মধ্যে ভেদাভেদ করেন না। ছেলে-মেয়ে উভয়কে সমান অধিকার দিয়ে থাকেন। কিন্তু এত কিছুর পরও আধুনিক এ যুগে কন্যাসন্তানকে বোঝা মনে করা হয়। শুধু আমাদের দেশে না, আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের মতো বড় বড় দেশেও এই পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব এখনো বিদ্যমান।
সমাজের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কন্যাশিশুকে জন্ম থেকেই পরের সম্পদ মনে করা হয়, অর্থাৎ সে তো জন্মই নিয়েছে পরের ঘরের বউ হতে! এ মনোভাব আমাদের সমাজে এখনও বিদ্যমান। অথচ আজ নারীরাই অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হয়ে মা-বাবার দায়িত্ব পালন করছেন। তারপরও এই মনোভাব জোঁকের মতো জেঁকে বসে আছে আমাদের মস্তিষ্কে।
পুরুষ হচ্ছে বংশের প্রদীপ- এমনটাই বলা হয় সমাজে। তাঁদের সন্তানই বংশ রক্ষা করবে। অথচ বিজ্ঞান মতে ছেলে-মেয়ে উভয়ের সন্তানের সঙ্গে তাদের পিতা-মাতার রক্তের সম্পর্ক সমানভাবে বিদ্যমান। তাই কন্যা বা ছেলেসন্তান উভয়েই দুটি বংশের ধারাকে সমানভাবে বহন করে। বিজ্ঞান না জানার কারণে কুসংস্কারকে মাথা থেকে তাড়াতে পারছি না এখনো আমরা।
এছাড়াও আমাদের মধ্যে আরও একটি ধারণা বিদ্যমান যে, পুরুষেরা সব কাজ পারেন, নারীরা পারেন না। শারীরিক দিক দিয়ে নারী-পুরুষের মধ্যে শক্তি-সামর্থ্যের ভেদাভেদ আছে, তা স্বাভাবিক। কিন্তু এই প্রযুক্তির যুগে এসে কেন শারীরিক সামর্থ্যের কথা আসবে? ভারোত্তোলন এখন পুরুষ বা নারী কারোরই সামর্থ্যের মধ্যে ধরা অবান্তর, যেখানে প্রযুক্তিই ভারোত্তোলনে সক্ষম। শুধু শারীরিক ক্ষমতা দিয়ে নারী-পুরুষের বিচার করা ঠিক না।

পুরুষেরা আমাদের সমাজে নিরাপদ কিন্তু একজন নারী নিরাপদ না। পুরুষ যেখানে খুশি যেতে পারেন, কেউ তাঁদের সম্ভ্রমহানি করে না। অথচ একজন নারী তা পারে না, আট মাসের শিশুকন্যা থেকে শুরু করে ৭০ বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত ধর্ষিত হয়, সেখানে কিশোরী আর তরুণীদের নিরাপত্তার কথা যেন অলীক ভাবনা।
উল্লেখিত কারণগুলো ছাড়াও আরও অনেক কারণ রয়েছে যার জন্য একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমরা কন্যাশিশুদের বোঝা মনে করি। নারীবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নারীদের প্রতি অত্যাচারের বিরুদ্ধে। আমাদের দেশে বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামালের মতো অসংখ্য সাহসী নারীরা জন্ম নিয়েছেন, নারী অধিকারের পক্ষে কাজ করেছেন। তারপরও আমাদের দেশে নারী ফুটবলারদের খেলা বন্ধ করে দেওয়া হয়, শুধু নারী হওয়ার দোষে। আর প্রতিদিন হাজারো নারী যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছে রাস্তা, বাসে যাতায়াতের সময় । তবুও নারীরা হার মানছেন না। সাহস আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে তাঁরা লড়ে যাচ্ছেন।



