কন্যাশিশুকে পিতার সামনে মা/রধর অমানবিক ও বেআইনি বটে

সম্প্রতি মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে পুলিশি অভিযানে গ্রেপ্তারকালে এক পিতা ও তার শিশুকন্যাকে চড় মারার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। জানা যায়, পুলিশি অভিযান চলাকালে রুস্তম নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর তার সাত-আট বছরের কন্যা বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে। বাবাকে যেন ছেড়ে দেয় পুলিশ, শিশুটির অনুনয়।
জানা যায়, সেখানে একজনকে রুস্তমের গালে চড় মারতে দেখা যায়। এতে শিশুটি ‘আব্বা’ বলে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকলে তাকেও চড় মারা হয়। শেষ পর্যন্ত রুস্তমসহ অন্যরা শিশুটিকে বুঝিয়ে সেখান থেকে সরিয়ে দেন।
পুলিশ বলছে, রুস্তম মাদক কারবারি। গত বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) ভোরে জেনেভা ক্যাম্পে মাদক কারবারি দুটি পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের সময় ককটেল বিস্ফোরণে নিহত হয় মো. জাহিদ (২০) নামে এক তরুণ। তার বিরুদ্ধেও মাদক কারবারে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগ ছিল। তার মৃত্যুর পর সেখানে অভিযান চালায় পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনী। তবে সামাজিক মাধ্যমে চড় মারার দৃশ্যটি সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অশ্রুসিক্ত কন্যশিশুকে পিতার সামনে কিংবা কন্যাটির সামনে পিতাকে মারধর অমানবিক ও বেআইনি বটে।
যদিও ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার বলেছেন, অভিযান-সংশ্লিষ্ট কেউ গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে চড় মারেননি। তবে সহকর্মীদের পক্ষে সাফাই গাওয়া সব বাহিনীরই পুরোনো অভ্যাস। তাই উপকমিশনার সাহেবের ওই বক্তব্যে বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ নেই। এমনকি কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অপেশাদার আচরণের প্রমাণ পেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাতেও আশ্বস্ত হওয়ার সুযোগ কম।
২০১৩ সালে প্রণীত ‘নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন’- এ ভুক্তভোগীরা নিরাপত্তা হেফাজতে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের বিচার চাইতে পারেন। কিন্তু এর প্রয়োগ নেই বললেই চলে। আইন প্রণয়নের সাত বছর পর, ২০২০ সালের ৯ জানুয়ারি প্রকাশিত বিবিসির এক প্রতিবেদন বলেছে, তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, ২০১৯ সাল পর্যন্ত ওই আইনে মাত্র ১৭টি মামলা হয়েছে। অথচ ওই সময়ে হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে শতাধিক। নির্যাতনেরও শেষ নেই।
ধারণা করা হয়েছিল, গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির পর অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতনেরও অবসান ঘটবে। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের মুখপাত্ররা এমন দাবিও করেন, এসব নৃশংস ঘটনা তাদের সময়ে ঘটেনি। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন বলছে, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর হেফাজতে ৩৪ জনের অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটেছে। জেলখানাতে এ সময়ে সংঘটিত অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা আরও বেশি, ৬৯ টি ।
রুস্তমকে চড় মারার ঘটনা নিঃসন্দেহে হেফাজতে মৃত্যুর তুলনায় নগণ্য। তবে তা যে বেআইনি এবং ‘বদলে যাওয়া’ পুলিশের সঙ্গে যায় না– সেটা স্বীকার করতে হবে।
রুস্তমকে নির্যাতন করা হয়েছে তারই শিশুকন্যার সামনে। আবার শিশুটিকেও নির্যাতন করা হয়েছে তাঁর বাবার সামনে, যা অমানবিক। এতে ওই শিশুকে শুধু শারীরিক নয়, মানসিক নির্যাতনও করা হলো। এই ঘটনা শিশুটিকে ট্রমার মধ্যে ফেলে দিলে তার দায় কে নেবে?
প্রায় দেড় বছর ধরে যারা রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমে জাতিকে উদ্ধারে ব্যস্ত, তাদের কাছেও সম্ভবত এর উত্তর নেই। এমনকি আমাদের রাষ্ট্র, সরকার এমনকি সমাজের কাছেও এর কোনো উত্তর নেই। আর পুলিশ নিজেই তো সম্ভাব্য অভিযুক্ত।



