২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | বুধবারবাংলা: ৮ আশ্বিন ১৪৩৩
নারী

উপকূলের নারীদের ভরসা বাড়ছে: স্বাভাবিক প্রসবে ফিরছে আস্থা

IMG-20251027-WA0073

দুই বছর আগেও পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার বকুলবাড়িয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ছিল প্রায় অচল অবস্থায়। ওষুধের অভাব, জনবল সংকট আর চিকিৎসাসেবার ঘাটতিতে এখানে কেউ আসত না। প্রসূতি মায়েদের যেতে হতো শহরে—যেখানে সিজারিয়ান ডেলিভারির খরচ সামলানো কষ্টসাধ্য ছিল। মা ও নবজাতক দুজনেরই ঝুঁকি থাকত বেশি।

এখন সেই দৃশ্য পাল্টে গেছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে একই কেন্দ্রে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৫টি স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন হয়েছে—যা আগের বছরের দ্বিগুণ। রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে তিন গুণের বেশি।এখানে এখন গর্ভকালীন, প্রসবকালীন ও প্রসবোত্তর সেবার পাশাপাশি নবজাতক ও যৌনবাহিত রোগের চিকিৎসাও দেওয়া হচ্ছে।

প্রয়োজনীয় ২২ ধরনের ওষুধ, স্যালাইন, ইনজেকশন, গ্লাভস, গজ, টেপ, স্যানিটারি ন্যাপকিন—সবকিছুই এখন নিয়মিত সরবরাহ করা হয়।

বকুলবাড়িয়া গ্রামের গৃহবধূ লামিয়া বেগম (২৬) বলেন, “আমাগো মতো গরিব মাইনষের অনেক উপকার হইছে। আগে ভয় পাইতাম, শহরে গেলে টাকাও লাগত। এখন বিনা পয়সায় সেবা পাই।”

কেন্দ্রের পরিবার কল্যাণ সহকারী খাদিজা আক্তার জানান, “আগে মানুষ আসত না, ওষুধও থাকত না। এখন নিয়মিত সেবা দিচ্ছি—স্বাভাবিক প্রসবও অনেক বেড়েছে।”

একই পরিবর্তনের চিত্র দেখা যাচ্ছে বরগুনার তালতলী উপজেলার বেহালা কমিউনিটি ক্লিনিকেও। এক বছর আগেও সেখানে ওষুধ ও জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ছিল না। এখন প্রতিদিন ৪০–৫০ জন মা ও শিশু সেবা নিচ্ছেন, আর আগামী মাস থেকে চালু হচ্ছে ডায়াবেটিস পরীক্ষার ব্যবস্থাও।

Advertisements

বেহালা গ্রামের চার সন্তানের মা রাজিয়া বেগম (২৮) বলেন, “আগে ক্লিনিকে আসতাম না, এখন দরকারি সব ওষুধ এখানেই পাই, তাই নিয়মিত আসি।”

সম্প্রতি পটুয়াখালী ও বরগুনার চারটি ইউনিয়নের স্বাস্থ্যকেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে—সবকটিই এখন অনেক পরিচ্ছন্ন ও সরঞ্জামসমৃদ্ধ। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুদের ভিড়ে ব্যস্ত সময় কাটে ক্লিনিকগুলোতে।

এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে আয়ারল্যান্ডভিত্তিক মানবিক সংস্থা কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইড। স্থানীয় সংগঠন নজরুল স্মৃতি সংসদ (এনএসএস) ও আভাস-এর সহায়তায় সংস্থাটি ‘উপকূলীয় অঞ্চলে নারী, নবজাতক, শিশু, কিশোর-কিশোরী ও মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়নে অংশীদারিত্ব’ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই চার বছর মেয়াদি প্রকল্পে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয়েছে। এর ফলে স্বাভাবিক প্রসবের হার বেড়েছে, সেবার মানও উন্নত হয়েছে। ইতিমধ্যে এক লাখ ৬৬ হাজারের বেশি নারী, শিশু ও কিশোর-কিশোরী এই প্রকল্পের আওতায় সেবা পেয়েছেন।

সরকারও একইসঙ্গে মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রজননসেবা সম্প্রসারণে কাজ করছে। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোর জন্য নতুন উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর জন্য গঠিত হয়েছে স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট।

কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইডের প্রোগ্রাম পরিচালক ডা. শেখ শাহেদ রহমান বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় মা ও শিশুর শ্বাসকষ্ট, জ্বর, ডায়রিয়া, ত্বকের রোগ বেড়েছে। তাই স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি। পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ ও জনগণের অংশগ্রহণ দরকার।”

তৃণমূলে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সারা দেশে গড়ে তোলা হয়েছিল ১৪ হাজারেরও বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক। বর্তমানে এসব ক্লিনিকে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ লাখ মানুষ সেবা নিচ্ছেন।

তবে অর্থ সংকটে টানা ১১ মাস বন্ধ ছিল ওষুধ সরবরাহ ও সেবা কার্যক্রম। নতুন করে কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট আইন কার্যকর হওয়ায় এখন আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে এসব ক্লিনিক। ১২০ কোটি টাকার ওষুধ ইতোমধ্যে পাঠানো হয়েছে সারাদেশে, আরও ৪৫ কোটি টাকায় ওষুধ কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আখতারুজ্জামান জানান, “এখন থেকে উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের বাজেটের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ চিকিৎসাসেবায় ব্যয় করা যাবে। ডিসি ও ইউএনওরা বিষয়টি তদারক করছেন।”

এছাড়া ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে ৪,৫৭৯টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব জমা পড়েছে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আশরাফী আহমদ বলেন, “সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি বরাদ্দেই চলবে। নতুন প্রকল্প অনুমোদন হলে আগের চেয়ে আরও বড় পরিসরে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।”

Advertisements